প্রতি বছর ৫ জুন আসে আমাদের একটাই পৃথিবীর প্রতি দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দিতে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস নিছক আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়; এটি এখন বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। ১৯৭২ সালের এই দিনে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘের ‘মানব পরিবেশ সম্মেলন’-এর স্মরণে ১৯৭৩ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। প্রথম বারের স্লোগান ছিল “একটাই পৃথিবী”। বর্তমানে ১৪৩টিরও বেশি দেশ এতে অংশ নিয়ে এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশবাদী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে।
ইতিহাসের পটভূমি; স্টকহোম থেকে বৈশ্বিক কাঠামো
স্টকহোম সম্মেলনের সবচেয়ে বড় অর্জন জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর প্রতিষ্ঠা। এই সংস্থাই বৈশ্বিক পরিবেশ নীতি প্রণয়ন ও সমন্বয়ের মূল কারিগর। লক্ষণীয়, ওই সম্মেলনে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ভাষণ দিয়ে দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার সম্পর্ককে সামনে আনেন—যে বক্তব্য এখনও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থানের ভিত্তি।
আয়োজক দেশ ও প্রতিপাদ্যের কৌশল
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের অনন্যতা হলো প্রতি বছর কোনো না কোনো দেশ স্বাগতিকের দায়িত্ব নেয়। ২০২৩ সালে কোট ডি’আইভরি আয়োজক ছিল, প্রতিপাদ্য ছিল “প্লাস্টিক দূষণের সমাধান”। ২০২৪ সালে সৌদি আরব “ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ প্রতিরোধ ও খরা সহনশীলতা” প্রতিপাদ্যে জোর দেয়। বৈশ্বিক সংকটের তীব্রতা বিবেচনা করেই এই থিম নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের গর্ব; পলিথিন নিষিদ্ধের সাহসী অধ্যায়
২০০২ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন শপিং ব্যাগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে কেনিয়া, রুয়ান্ডাসহ ৬০টিরও বেশি দেশ এই পথ অনুসরণ করে। দিবসটিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বন অধিদপ্তর, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান শুরু হয়, যা দেশের বনায়ন কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি।
পরিসংখ্যানের সতর্কবার্তা
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর ৪০০ মিলিয়ন টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এই তথ্য প্রমাণ করে, পরিবেশ রক্ষা বিলাসিতা নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন।
আমাদের করণীয়
সবুজ অঙ্গীকারের মডেল শুধু সেমিনার বা গাছ লাগানোর আনুষ্ঠানিকতার বাইরে ‘বৃত্তাকার অর্থনীতি’ গ্রহণ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন এবং ব্যক্তিগত কার্বন পদচিহ্ন হ্রাসের বিকল্প নেই। তার সঙ্গে দরকার সামাজিক আন্দোলন। সে লক্ষ্যে আগামী ৫, ৬ ও ৭ জুন ২০২৬ তিন দিনব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি হবে একটি চলমান পরিবেশবান্ধব আন্দোলন। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, রাস্তার পাশ ও জনসমাগমস্থলে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হবে। বিশেষ করে মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে কামিনী, নিম, আম গাছ লাগানো হবে।
একটি সন্তান, একটি গাছ
সবচেয়ে মর্মস্পর্শী উদ্যোগ—কোনো পরিবারে নতুন সন্তান জন্ম নিলে তার নামে একটি গাছ রোপণ। মেয়ে সন্তানের জন্য কামিনী, নিম, বকুল; আর ছেলে সন্তানের জন্য আম, কাঁঠাল, জাম, জলপাই গাছ লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গাছটিও বেড়ে উঠবে, যা ভবিষ্যতে পরিবেশ ও সমাজের জন্য অমূল্য সম্পদ হবে। এই ধারণা শুধু গাছ লাগানো নয়, আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার প্রতীক
সম্মিলিত অঙ্গীকার
একটি গাছ লাগানো মানে একটি জীবন বাঁচানো। সন্তানের সাথে বেড়ে উঠুক একটি গাছ, সবুজ হোক আমাদের সমাজ—এ স্লোগানে আমরা চাই প্রতিটি নবজাতকের আগমন হোক সবুজ অঙ্গীকারে স্মরণীয়। পরিবেশ রক্ষার এ লড়াই একার নয়, সম্মিলিত। আসুন, ২০২৬-এর এই আয়োজনে অংশ নিয়ে আমরা একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাই।
লেখক: প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অফ মনোহরদী মডেল কলেজ,(বি জে এস এম মডেল কলেজ)মনোহরদী, নরসিংদী।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।
