সংলাপ আটকে আছে ২৪০০ কোটি ডলারে, ব্যাপক যুদ্ধের হুমকি রেজাই’র

সিএনএন এক্সক্লুসিভ

সংলাপ আটকে আছে ২৪০০ কোটি ডলারে, ব্যাপক যুদ্ধের হুমকি রেজাই’র

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি ট্রাম্প প্রশাসন ২৪০০ কোটি ডলারের স্থগিত (ফ্রোজেন) ইরানি সম্পদ মুক্ত করতে রাজি হওয়ার ওপর নির্ভর করছে বলে শুক্রবার সিএনএনকে জানিয়েছেন ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় আটকে আছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় যুদ্ধ শুরু করে তবে তারা এক অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই তেহরানে সিএনএনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, সংলাপ অচলাবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে এই অচলাবস্থা ভাঙতে হবে। বল এখন ট্রাম্পের কোর্টে। খবরে বলা হয়, ইরান দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে ১২০০ কোটি ডলার ফেরত দিতে হবে। পরবর্তী পর্যায়ে আরও ১২০০ কোটি ডলার দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই অর্থ মুক্ত করে দিলে ইরানের ওপর তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপের হাতিয়ার হারিয়ে যাবে। ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি চান যা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি কঠোর বলে প্রতীয়মান হবে। তিনি এমন কিছু এড়াতে চান যা ‘নগদ অর্থের প্যালেট’ হস্তান্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় তেহরানকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনায় তিনি আগে এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন।

সিএনএনকে দেওয়া বিরল এই সাক্ষাৎকারে রেজাই ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মহলের যুদ্ধ-পরবর্তী দৃষ্টিভঙ্গি, হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ এবং দেশটি আবার হামলার শিকার হলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে সেসব বিষয়ে আলোকপাত করেন। তার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ তিনি এখনও ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা প্রকাশ্যে দেখা দেননি, কারণ যুদ্ধের প্রথম দিনে তার পিতা নিহত হওয়া এক ইসরায়েলি হামলায় তিনি আহত হয়েছিলেন।

স্থগিত ইরানি সম্পদ মুক্ত করা: রেজাই এই দাবিকে আস্থা তৈরির একটি পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ট্রাম্প প্রশাসন যদি অর্থ মুক্ত করে, তাহলে তা ইরান ও আমেরিকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। রেজাই বলেন, যদি ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে চান, তাহলে এই ২৪০০ কোটি ডলার হলো আস্থার একটি পরীক্ষা, যা ইরান ট্রাম্পের সঙ্গে করতে চায়। এটি এমন একটি পরীক্ষা যাতে আমেরিকাকে উত্তীর্ণ হতে হবে। আর তখনই সব পথ খুলে যাবে। তিনি আরও বলেন, এটি আমাদের নিজেদের অর্থ, আমেরিকার অর্থ নয়।

যুদ্ধে ফেরার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা: রেজাই সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার সংঘাতে জড়ায়, তাহলে ইরান যুদ্ধকে পারস্য উপসাগরের বাইরেও বিস্তৃত করবে। তার মতে, সামরিক অভিযান হরমুজ প্রণালী থেকে ভারত মহাসাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালী, লোহিত সাগর এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আমরা যেসব মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করেছি, সেগুলোর পাশাপাশি আরও অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে আমরা যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেব। তবে তিনি যোগ করেন, যুদ্ধের সম্ভাবনা কম।
ট্রাম্প ও খামেনির সম্ভাব্য বৈঠক: খামেনির স্বাস্থ্য ও দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেননি রেজাই। তবে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। রেজাই বলেন, এটি হবে না। এখন আমরা আলোচনার প্রথম ধাপে আছি এবং মি. ট্রাম্প আলোচনাকে স্থবির অবস্থায় নিয়ে গেছেন। এটি হবে না। এ সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ও খামেনি ভালোভাবেই এগোচ্ছেন এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারলে তিনি সম্মানিত বোধ করবেন।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে দাবি পুনর্ব্যক্ত: রেজাই বলেন, বিশ্বে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর ইরান ও ওমানের সার্বভৌমত্ব রয়েছে এবং তারা যৌথভাবে এটি পরিচালনা করবে। জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ নেওয়ার বিষয়টিকে তিনি টোল হিসেবে বর্ণনা করতে অস্বীকৃতি জানান। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনার ব্যয় একা ইরানের বহন করা উচিত নয়, তাই রক্ষণাবেক্ষণ ফি নেওয়া হবে।
কে এই রেজাই? আইআরজিসির পুরোনো প্রজন্মের একজন সদস্য হিসেবে রেজাই ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বাহিনীটির নেতৃত্ব দেন। তার সময়েই বাহিনীটি ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এই নেতা পরে সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলে যোগ দেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিলেও কখনও জয়ী হননি।
যুদ্ধ ও পরবর্তী পরিস্থিতি: ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পারস্য উপসাগরের ১২টি দেশে হামলা চালায়। সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এসময়। এছাড়া, ভারত মহাসাগরে ইরান থেকে প্রায় ২ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়ার দিকেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল বলে খবর পাওয়া যায়, যা তাদের সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে দেখা হয়।

সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে আসা এবং আলোচনায় তার কথিত অস্পষ্টতার কৌশলের কথা উল্লেখ করেন। আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালাতে পারে এমন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন রেজাই।

তিনি বলেন, তখন বিশ্ব ইরানের প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে পারবে, কারণ আমাদের স্থলবাহিনীর শক্তি আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির চেয়ে বহু গুণ বেশি। বর্তমান সংঘাতকে তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম সামরিক বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেন। রেজাই বলেন, এই প্রথম ইরান যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এসেছে, যেখানে আগের সব যুদ্ধে ইরান পরাজিত হয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন