ঘরে-বাইরে প্রবল চাপে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় দলের নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে চলে যাবার পর এবার সংসদেও তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের অপারেশন শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের একটি খুন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে আইনের জালেও জড়িয়ে পড়তে চলেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে দু’দুটি এফআইআর হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শুক্রবার কালীঘাটের বাড়িতে মমতা দলের কাঠামো নিয়ে আলোচনার জন্য শীর্ষ নেতাদের এক বিশেষ বৈঠক ডেকেছিলেন। কিন্তু সেই বৈঠকে মূলত মমতা অনুগামীরাই এসেছিলেন। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কেউ যান নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন পশ্চিমবঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে সংসদেও আছড়ে পড়তে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় একটি বড় বিদ্রোহের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরও গভীর হওয়ার মধ্যেই এই নতুন সংকটের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২৩ জন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ রাজ্যের বিধায়কদের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ফলে আগামী সপ্তাহে দলের সংসদীয় শাখায় বিভাজনের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে গণমাধ্যমের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, বিজেপি’র পক্ষ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন ধরাতে একাধিক সাংসদকে ফোন করা হয়েছে। অভিযোগ, ভয় দেখানোর পাশাপাশি আর্থিক টোপ দেয়া হয়েছে। সূত্র মতে, বিজেপি’র এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ সাংসদদের কারও কারও বৈঠক হতে পারে।
গত কয়েকদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সংসদে ভাঙনের জল্পনা জোরদার হয়েছে। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলনেতা বর্তমানে দলের বিতর্কিত সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাকে সাংসদের মধ্যেও অনেকে মানতে চাইছেন না। বেশ কয়েকজন সাংসদ দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীর ওপর অসন্তুষ্ট বলে জানা গেছে। নেতৃত্বের মধ্যে এই ক্রমবর্ধমান অস্বস্তির কারণেই সংসদে একটি পৃথক জোট গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ও প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বিধানসভার এই অস্থিরতা সংসদেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাজ্য বিধানসভায় বিদ্রোহের ব্যাপকতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিদ্রোহের গতি ও মাত্রা দলের অভ্যন্তরে ব্যাপক অস্থিতিশীলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘এত অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৬০ জন বিধায়কের বিদ্রোহ আমি কখনো দেখিনি। লোকসভাতেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’’
তার এই মন্তব্য তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় কাঠামোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভেদের জল্পনাকে আরও তীব্র করেছে। রায় এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাজ্যসভাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না, যদিও তিনি কোনো দৃঢ় ভবিষ্যদ্বাণী করা থেকে বিরত থেকেছেন।
লোকসভায় বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন, যেখানে দলত্যাগ বিরোধী আইনের বিধান অনুযায়ী লোকসভায় একটি পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে কমপক্ষে ২২ জন (দুই- তৃতীয়াংশ) সাংসদের প্রয়োজন। রাজ্যসভায় দলটির ১৩ জন সদস্য রয়েছেন, যেখানে স্বীকৃতির জন্য ন্যূনতম ৯ জন সাংসদের সমর্থন প্রযোজন আলাদা গোষ্ঠী হওয়ার জন্য।
একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, কয়েক দফা রাজনৈতিক আলোচনা ও বৈঠকের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে’। রাজ্যসভাতেও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। অনুমান করা হচ্ছে আগামী ৮ই জুন দিল্লিতে যখন বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা, তখনই লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশের অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক উপলক্ষে মমতা ও অভিষেকের দিল্লিতে থাকার কথা।
লোকসভায় দলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই সমাজমাধ্যমে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা পোস্ট করে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার। তার পোস্টে নীতি, আদর্শ এবং শাসনব্যবস্থার প্রসঙ্গ উঠে আসায় রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা শুরু হয়েছে।
সূত্রের দাবি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তৃণমূলের একাধিক সাংসদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে পারে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের অনুমান, সেই বৈঠকের পর লোকসভার স্পিকারের কাছে একটি চিঠি জমা দেয়া হতে পারে। সেখানে লোকসভায় নতুন দলনেতা হিসেবে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নাম প্রস্তাব করা হতে পারে বলেও আলোচনা চলছে। যদিও এই বিষয়ে কাকলি নিজে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এমন কোনো পরিকল্পনার বিষয়ে তার জানা নেই।
লোকসভার সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার সমাজমাধ্যমে শুক্রবার দাবি করেছেন, পূর্বতন সরকারের নীতির বিরুদ্ধেই ভোটবাক্সে রায় দিয়েছে মানুষ। সেটাই ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির কারণ। কিছুদিন আগে লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের চিফ হুইপের পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেন মমতা। তার জায়গায় আনা হয় শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেখান থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। পদ হারানোর পরের দিনই সমাজমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন কাকলি। লিখেছিলেন, ’৭৬ থেকে পরিচয়, ’৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।
মমতার বিরুদ্ধে দু’টি এফআইআর: পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশের হাদি হত্যা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে আইনের জালে জড়িয়ে পড়তে চলেছেন। মমতার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে সমাজ মাধ্যমেও দাবি উঠেছে। গত দু’দিনে মমতার বিরুদ্ধে দু’টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। বৃহস্পতিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা’। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর লালবাজারের সাইবার ক্রাইমে এই অভিযোগ জানানো হয়েছে। এর আগে রিঙ্কু চট্টোপাধ্যায় সিংহ নামে এক আইনজীবী শিলিগুড়ির সাইবার ক্রাইম থানায় মমতার বিরুদ্ধে একই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করেন।
গত ২রা জুন কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে নির্বাচনে পরাজয়ের পর প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে আচমকাই তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তোলেন। যদিও তিনি সরাসরি কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি, তবে তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ওসমান হাদি হত্যার ঘটনাকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাংলাদেশের একটি বড় হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদের রাজ্যের এসটিএফ গ্রেপ্তার করেছিল। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ওই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী কী তথ্য সামনে এসেছিল, সে বিষয়ে তিনি সবই জানেন। তার বক্তব্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ভূমিকাও উঠে আসে। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থের কথা উল্লেখ করে কিছু তথ্য প্রকাশ না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
মমতার এই মন্তব্য নিয়ে রাজনীতিতে শোরগোল তৈরি হয়েছে। অবশ্য ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
হিন্দু মহাসভার রাজ্য সভাপতি চন্দ্রচূড় গোস্বামী লালবাজার সাইবার ক্রাইম শাখার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে লেখা চিঠিতে দাবি করেছেন, মমতার মন্তব্যের জন্য বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। তৃণমূল নেত্রীর মন্তব্য ‘দেশদ্রোহিতার’ শামিল। দেশের গরিমা এবং নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে মমতার বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য পুলিশের কাছে আর্জি জানিয়েছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটি।
