ঘর জুড়ে সন্তানদের নিয়ে একসময় থাকে হাসি-আনন্দ। সময়ের বিবর্তনে সেই ঘরে নেমে আসে নীরবতা। রোগ-ব্যাধি আর বয়সের ভাঁজে নুয়ে পড়ে বাবা-মায়ের শরীর। কমে আসে চলাফেরা, হাসি-আনন্দ আর মমতায় ঘেরা স্পর্শ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তে থাকে প্রিয়জনদের দূরত্ব। কারও কারও জীবনের শেষ অধ্যায়ে কাটে নিঃসঙ্গ-একাকিত্বের মধ্যে। যে ঘর একসময় সন্তানের কোলাহলে ছিল মুখর, সেই ঘরই পরিণত হয় নিঃসঙ্গতার কারাগারে। জীবনভর সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা বাবা-মায়ের পরিণতি কেন এমন হচ্ছে? কেন নিঃসঙ্গতায় নিভে যাচ্ছে জীবনের প্রদীপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্ব শুধু মানসিক কষ্টই নয়, এটি শারীরিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন একা থাকলে হতাশা, উদ্বেগ, অনিদ্রা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গ মৃত্যু শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি। যে বাবা-মা একসময় সন্তানের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন, শেষ বয়সে তাদের একা পড়ে থাকার ঘটনা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষের পারিবারিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। প্রতিযোগিতামূলক জীবনে নিজের পরিবার, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যে অনেকেই বাবা-মায়ের জন্য আলাদা সময় বের করতে পারছেন না। ফলে সম্পর্কের দূরত্ব ধীরে ধীরে মানসিক দূরত্বেও রূপ নিচ্ছে। আবার কিছু প্রবীণ মানুষ নিজেরাও সন্তানদের ওপর বোঝা হতে চান না। অসুস্থতা, দুর্বলতা কিংবা আর্থিক নির্ভরতার কারণে তারা নিজেদের কষ্ট অনেক সময় গোপন রাখেন। সন্তানদের ব্যস্ততার কথা ভেবে প্রয়োজনের কথাও বলতে চান না। এতে একাকিত্ব আরও গভীর হয়।
সম্প্রতি এক মায়ের করুণ পরিস্থিতি নাড়া দিয়েছে সর্বত্র। কোলে-পিঠে মানুষ করা সন্তানদের মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের মরদেহ পড়ে ছিল যে কক্ষে সেই কক্ষের দৃশ্য দেখেও অনেকে আঁতকে উঠেছেন। বাকরুদ্ধ হয়েছেন। নুরজাহান বেগমের সন্তানদের প্রতি ধিক্কার ও ঘৃণা প্রকাশ করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই ঘটনাকে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থায় পচনের লক্ষণ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
সম্প্রতি মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় নুরজাহান বেগমের মরদেহ। তার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, মেয়ে স্কুলশিক্ষক। তাদের মা ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে ছিলেন নিঃসঙ্গ। একই বাসায় নুরজাহান বেগমের মেয়েও থাকেন। বাসার একটি কক্ষে মারা যান নুরজাহান। মৃত্যুর পর লাশ পড়ে ছিল সেখানে। মরদেহে পচন ধরে মাংস খসে পড়ছিল শরীর থেকে- এমন তথ্যও আসে। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুয়েটের শিক্ষক সন্তান ওই বাড়িতে গেলেও যুগ্ম সচিব ছেলে সেখানে যাননি। রোববার নুরজাহান বেগমের মেয়ে তার মাকে ডাকতে গেলে সাড়া না পেয়ে একজন নার্সকে ডাকেন।
তিনি ভেবেছিলেন তার মা অসুস্থ। পরে নার্স বাসায় এসে দেখতে পান তিনি মারা গেছেন। জানতে পেরে প্রতিবেশীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে খবর দিলে পুলিশ বৃদ্ধার পচা-গলা মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক)। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পুরো বাসাটি ছিল নোংরা, পরিত্যক্ত ও অগোছালো। মায়ের প্রতি অবহেলার দায়ে যুগ্ম সচিব ছেলেকেও ইতিমধ্যে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে তার চার সন্তানের কাছে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনার পর বুধবার পল্লবী থানার সেকশন ৬ এলাকার ১০ নম্বর রোডের সি ব্লকের ১৪ নম্বর বাসা থেকে সেলিনা আফরোজ (৫৫) নামে আরেক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তার স্বামী মমিনুল হক ও দুই সন্তান দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় থাকেন। পারিবারিক কলহের কারণে ১২ বছর আগে তিনি কানাডা থেকে দেশে চলে আসেন। এরপর থেকে বাবার পৈতৃক ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করতেন তিনি। তার আরেক বোন ঐ ভবনের চার তলায় থাকতেন। গত ২৬শে মে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে নিহত সেলিনা আফরোজের সঙ্গে তার ভাতিজা আশফাকুর রহমানের সর্বশেষ কথা হয়। এরপর আর তার কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। শুধু এ দু’টি ঘটনাই নয়, এমন ঘটনা ঘটছে অহরহ। কোনোটা প্রকাশ্যে আসে আবার কোনোটা আড়ালেই থেকে যায়। দেশে বয়স্ক বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব সন্তানের। এ বিষয়ে আইনও আছে।
যা আছে আইনে: ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ছেলেমেয়েরাই সাধারণত বাবা-মাকে বৃদ্ধ বয়সে দেখে শুনে রাখেন। তবে বিষয়টি নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময় নানান অভিযোগ ওঠার কারণে ২০১৩ সালে এ নিয়ে একটি আইনও পাস করে সরকার। ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ নামের ওই আইনে প্রতিটি সামর্থ্যবান ছেলেমেয়েকে তার বাবা-মায়ের ভরণপোষণ তথা- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, সঙ্গ সেবা প্রদানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। আরও বলা হয়েছে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সন্তানদেরকে তাদের সঙ্গে একই স্থানে বসবাস করতে হবে।
বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না। চাকরি বা অন্যকোনো কারণে সন্তানরা পিতা-মাতার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করলে নিয়মিতভাবে তাদেরকে বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেয়া এবং দেখা-সাক্ষাৎ করার কথা বলা হয়েছে। সেইসঙ্গে বাবা-মাকে নিয়মিতভাবে যৌক্তিক পরিমাণ টাকা-পয়সা প্রদান করার কথাও রয়েছে আইনে। আইন অনুযায়ী, ছেলেমেয়ের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা তাদের বৃদ্ধ দাদা-দাদি বা নানা-নানির দেখাশোনা করবেন। কেউ যদি এই আইন না মানে, সেক্ষেত্রে তাকে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা বা অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের কেউ যদি এই আইন বাস্তবায়নে বাধা দেন, তাহলে তিনি একই শাস্তি ভোগ করবেন বলেও আইনে বলা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটছে এটি বিভিন্ন সময় আমরা বলি যে, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মধ্যে অবক্ষয়গুলো ঘটছে কিন্তু আসলে তা না। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কারও না কারও মধ্যেই মূল্যবোধের অবক্ষয়গুলো দেখছি। আমাদের পরিবার ব্যবস্থায় মূল প্রত্যাশা হলো একজন ব্যক্তি পরিবারে জন্মগ্রহণ করবে সেখানে বড় হবে, সেখান থেকেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে এবং তার কাছের মানুষ সন্তানরা তাকে দেখভাল করবে, যেমন তিনি ছোটবেলায় তার সন্তানদেরকে বড় করেছেন। তিনি বলেন, কষ্টের একটি বিষয় হচ্ছে সরকার বা রাষ্ট্র ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ’ আইন পর্যন্ত করতে হয়েছে এই ধরনের ঘটনাগুলোকে সামনে রেখে। অনেক প্রতিষ্ঠিত সন্তান রয়েছে, যাদের আর্থিক সংকট নেই, যারা পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত তারা তাদের বাবা-মাকে দেখছে না, অবহেলা করছে এবং দেখার প্রশ্নে উদাসীনতা আছে। এ ছাড়া নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে। আমাদের পরিবার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে এই পরিবারের মধ্যেই আমাদের জীবন ব্যবস্থা একটি কার্যকরী সমাধান খুঁজতে হবে। আর সময়ের প্রেক্ষাপটে, যেহেতু এখন কর্মের পরিধি বেড়েছে- মানুষ কর্মের কারণে বিভিন্ন জায়গাতে অবস্থান করছে। মানুষের মনস্ত্তত্ত্ব পরিবর্তনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের প্রতি যত্নশীল ভূমিকা পালনের প্রশ্নে মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন হয়েছে। অনেক বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমের দিকে ধাবিত হতে হচ্ছে। আমাদের পরিবার ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে একটি নিরাপদ জীবন ব্যবস্থা যদি তৈরি এবং চর্চা করতে না পারি তাহলে এই বৃদ্ধাশ্রমের মধ্যদিয়ে আমাদের জীবনের শেষ হবে। সেটি রাষ্ট্রের জন্য কিন্তু একটি গভীর সংকট তৈরি করবে।
আইনজীবী কে এম মাহফুজ মিশু মানবজমিনকে বলেন, বাবা-মা যতই কষ্টে থাকুক তারা সবসময় সন্তানদের ভালো চান। প্রত্যেকটি সন্তানকে শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি নৈতিকতাটাও শেখাটা জরুরি। বাবা-মা চাইলে আইনগত প্রতিকার ও পদক্ষেপ নির্দ্বিধায় নিতে পারেন কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কোনো সদিচ্ছা দেখা যায় না। এমন কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে বাবা-মা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন এবং আইনগত প্রতিকার দিতে আদালতও বাধ্য। অনেক বাবা-মা আছেন তারা ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ সম্পর্কে জানেনও না।
