প্রত্যাহারের পরিবর্তে গাজায় ইসরাইলের ৪০টি সামরিক ঘাঁটি

আল জাজিরার অনুসন্ধান

প্রত্যাহারের পরিবর্তে গাজায় ইসরাইলের ৪০টি সামরিক ঘাঁটি

ফন্ট সাইজ:

অক্টোবরে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি অনুযায়ী গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল ইসরাইলের। তার পরিবর্তে ইসরাইলি সেনারা নীরবে সেখানে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করছে। দখল করে নেয়া গাজার ভূখণ্ডে তারা সুরক্ষিত সামরিক পোস্ট নির্মাণ করেছে। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে এ কথা বলেছে আল জাজিরা। আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিট পরিচালিত এক অনুসন্ধানে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে গাজা উপত্যকার ভেতরে ইসরাইলের ৪০টি পৃথক সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্লেষণে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে- ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এসব ঘাঁটির মধ্যে আটটি সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘাঁটির নির্মাণকাজ এখনো চলমান। এই সামরিক স্থাপনা নির্মাণ ইসরাইলের নেতৃত্বের ক্রমশ প্রকাশ্য হয়ে ওঠা ভূখণ্ডগত আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন। সম্প্রতি এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেন যে, তিনি গাজা উপত্যকার অধিকাংশ এলাকা (৭০ ভাগ) স্থায়ীভাবে দখলে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইসরাইলি বাহিনী বর্তমানে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত অবস্থান নিয়েছে। এই লাইন বলতে বাফার জোন ও সামরিক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোকে বোঝানো হচ্ছে, যা গাজার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত। নেতানিয়াহু বলেন, আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরছি; এখন আমরা ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছি। এরপর জনতার মধ্য থেকে কেউ পুরো গাজা সংযুক্ত করার দাবি জানালে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে এগোই। প্রথমে ৭০ শতাংশ। সেখান থেকেই শুরু করা যাক।


কবরস্থানের ওপর ঘাঁটি

স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসরাইল কেবল অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ পোস্ট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। নতুন স্থাপনাগুলো কৌশলগতভাবে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি উত্তর গাজায়, দুটি মধ্যাঞ্চলে, একটি নেতজারিম করিডোরের পূর্বে এবং তিনটি দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে নির্মিত হয়েছে। এই ভূখণ্ড দখল নীতির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি হলো খান ইউনিসের ইস্টার্ন সেমেট্রি (পূর্বে কবরস্থান)-এর ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বরেই বুলডোজার দিয়ে সমতল করা কবরস্থানে প্রকৌশলগত কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের ১৮ মে নাগাদ সেখানে সামরিক যানবাহন মোতায়েনের এলাকা এবং সারিবদ্ধ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়। সেগুলো সম্ভবত সেনাদের আবাসন ও সামরিক বৈঠকের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। উত্তর গাজাতেও একই ধরনের দ্রুত সামরিকীকরণের চিত্র দেখা গেছে। বেইত লাহিয়া এলাকায় ২০২৫ সালের অক্টোবরের ছবিতে যে স্থান সম্পূর্ণ খালি ছিল, সেখানে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই প্রকৌশলগত কাজ শুরু হতে দেখা যায়। ২০২৬ সালের মে মাস নাগাদ সেখানে অভ্যন্তরীণ সুবিধাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ বেষ্টনীঘেরা সামরিক স্থাপনা গড়ে ওঠে।


সামনের সারির অবস্থান আরও শক্তিশালী করা

নতুন ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরে আগে থেকেই থাকা সামরিক অবস্থানগুলোও দ্রুত সম্প্রসারণ করছে ইসরাইলি বাহিনী। ‘ইয়েলো লাইন’ মূলত সেই অস্থায়ী সীমারেখা, যেখানে পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাদের অবস্থানের অনুমতি ছিল। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সেখানে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, সাঁজোয়া যান মোতায়েনের নতুন এলাকা এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। মধ্য গাজায় স্যাটেলাইট সেন্সর একটি বিদ্যমান সামরিক স্থাপনার চারপাশে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খননের তথ্য শনাক্ত করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবস্থান ধরে রাখার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। এই অবকাঠামোর কৌশলগত উদ্দেশ্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় নেতজারিম করিডোর এলাকায়। এটি এমন একটি পথ, যা ব্যবহার করে ইসরাইলি বাহিনী উত্তর ও দক্ষিণ গাজাকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিট করিডোরটির পূর্বাঞ্চল ও আশপাশে তিনটি পৃথক সামরিক ঘাঁটি শনাক্ত করেছে, যা গাজার দুই অংশের মধ্যে চলাচলের ওপর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সহায়তা করছে। এই করিডোরের ঠিক পূর্বদিকে জুহোর আদ-দিক এলাকায় খোলা জমি ২০২৬ সালের মার্চে ভূমি খননকাজ শুরু হওয়ার পর দ্রুত একটি নতুন সামরিক ঘাঁটিতে রূপ নিতে শুরু করে।


অবরুদ্ধ জনসংখ্যাকে ঘিরে ফেলা

এই ৪০টি সামরিক ঘাঁটির ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এগুলো একটি পরিকল্পিত অবরোধ কৌশলের অংশ। মাটির বাঁধ, পরিখা ও অভ্যন্তরীণ সামরিক সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত ঘাঁটিগুলো বিভিন্ন দিক থেকে ফিলিস্তিনি জনবসতিকে ঘিরে রেখেছে। এই অবরোধমূলক কাঠামো বেসামরিক জনগণের চলাচল এবং নিজেদের জমিতে প্রবেশের ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে ফেলেছে, বিশেষ করে ইসরাইলি মোতায়েন লাইনের সংলগ্ন এলাকাগুলোতে। এই ক্রমবর্ধমান দখলদারিত্ব ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিটি ছিল প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২১ দফা শান্তি পরিকল্পনার ভিত্তিতে গঠিত। ওই কাঠামোতে যুদ্ধ বন্ধ, অবিলম্বে মানবিক সহায়তা প্রবেশ, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ধাপে ধাপে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়।

ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আক্রাবাউই বলেন, ৭ অক্টোবরের পর থেকে দখল, নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত আরও সামনে ঠেলে দেয়ার ধারণাই ইসরাইলের নিরাপত্তা মতবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তার মতে, ইসরাইলের নতুন কৌশল এমন অঞ্চল নিশ্চিত করা, যেখান থেকে ফিলিস্তিনি জনসংখ্যা ও নগর অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আক্রাবাউই সতর্ক করে বলেন, নির্মাণকাজের ব্যাপকতা ইঙ্গিত দেয় যে এটি কোনো অস্থায়ী বাফার জোন রক্ষার পরিকল্পনা নয়। তিনি বলেন, এই নির্মাণ এবং জনবসতিগুলোকে অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে তিনি (প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু) আবারও একটি নির্মূলমূলক যুদ্ধ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলছেন।


হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসরাইলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন। হতাহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতা থামেনি। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর গত সাত মাসে অন্তত ৯২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও ২ হাজার ৮১১ জন আহত হয়েছেন।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন