নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সংসদে দেয়া এক বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত-নেপাল সীমান্ত বিরোধকে নতুন করে আলোচনায় এনেছেন। তিনি দাবি করেছেন, শুধু ভারতই নেপালের ভূখণ্ড দখল করেনি, বরং নেপালও ভারতের কিছু ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। তার এই মন্তব্য নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ফেডারেল পার্লামেন্টে দেওয়া প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণে বালেন্দ্র শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমি একটি বিষয় জানতে পেরেছি, যা অনেককে বিস্মিত করবে। শুধু ভারত নেপালের ভূমি দখল করেনি, নেপালও ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভূমি দখল করে রেখেছে। তবে তিনি কোন কোন এলাকা সম্পর্কে এ মন্তব্য করেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
তিনি আরও বলেন, উভয় দেশের উচিত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। মাত্র ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ চলতি বছরের ২৭ মার্চ নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর আগে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন। স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সড়কের ধারের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন। রাজনৈতিক জীবনে আসার আগে তিনি একজন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ছিলেন। তার গানে দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয় উঠে আসত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টিতে যোগ দেন। ওই বছর ছাত্র-যুব আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ শর্মা অলির সরকার পতন ঘটে।
কালাপানি-লিপুলেখ বিরোধের ইতিহাস: ভারত ও নেপালের মধ্যে প্রায় এক হাজার আটশ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তের পশ্চিমাংশে অবস্থিত লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি অঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এই বিরোধের সূত্রপাত ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তি থেকে। অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের পর নেপাল ও ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, কালী নদীর পশ্চিমের অঞ্চল নেপাল ত্যাগ করবে। কিন্তু কালী নদীর প্রকৃত উৎস কোথায়, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কোনো মানচিত্রও চুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। নেপালের দাবি, কালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা থেকে। সে অনুযায়ী লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি নেপালের অংশ। অন্যদিকে ভারতের দাবি, সীমান্ত নির্ধারণকারী নদীর উৎস লিপুলেখে অবস্থিত। ফলে বিতর্কিত অঞ্চল ভারতের অন্তর্ভুক্ত। ভারত আরও দাবি করে, উনিশ শতকের ত্রিশের দশকের রাজস্ব নথিতে অঞ্চলটি ভারতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ছিল।
নতুন করে উত্তেজনা কেন? গত মাসে ভারত সরকার লিপুলেখ গিরিপথ হয়ে কৈলাশ-মানস সরোবর তীর্থযাত্রা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয়। মহামারির কারণে ২০২০ সালে এই যাত্রা বন্ধ হয়েছিল। এর পরপরই নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুনরায় জানায় যে লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি নেপালের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারত পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জানায়, ১৯৫৪ সাল থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীরা এই পথ ব্যবহার করে তীর্থযাত্রা করে আসছেন। ভারতের মতে, নেপালের দাবি ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়।
ব্রিটিশ মানচিত্রের সহায়তা চাইছে নেপাল: বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, সীমান্ত বিরোধে ঐতিহাসিক নথি সংগ্রহের জন্য নেপাল চীন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নেপাল যুক্তরাজ্যের মধ্যস্থতা চায় না; বরং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রাথমিক জরিপ মানচিত্র সংগ্রহ করতে চায়, যাতে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা যায়।
‘বৃহত্তর নেপাল’ বিতর্ক: বালেন্দ্র শাহ অতীতেও ‘বৃহত্তর নেপাল’ ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে ভারতের সংসদ ভবনে ‘অখণ্ড ভারত’-এর একটি দেয়ালচিত্র স্থাপনের পর তিনি নিজের কার্যালয়ে ‘বৃহত্তর নেপাল’-এর একটি মানচিত্র টাঙান। সেই মানচিত্রে বর্তমান ভারতের কিছু অঞ্চলকে ঐতিহাসিক নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। যদিও দুই পক্ষের এসব মানচিত্রই আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক মানচিত্র নয়, বরং ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের বিস্তৃত ধারণাকে তুলে ধরে।
নেপালের ভেতরে সমালোচনার ঝড়: প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর বিরোধী দলগুলোর নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। নেপালি কংগ্রেসের সংসদ সদস্য বসনা থাপা বলেন, যদি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তথ্যভিত্তিক না হয়, তাহলে তা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া উচিত। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সংসদ সদস্য রমেশ কুমার মল্লা মন্তব্য করেন, এই বক্তব্য দেশের জাতীয় অখণ্ডতার প্রতি অবমাননাকর। ভারতে নেপালের সাবেক রাষ্ট্রদূত নীলাম্বর আচার্যও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, নেপাল কখনো ভারতের কোনো ভূমি দখল করেনি।
বিতর্ক বাড়তে থাকলে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দেয় যে প্রধানমন্ত্রী মূলত সীমান্তবর্তী এলাকায় বাস্তব ব্যবহার ও আইনি সীমানার মধ্যে বিদ্যমান কিছু অসামঞ্জস্যের কথা বলতে চেয়েছিলেন। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কোথাও কোথাও নেপালের নাগরিকরা এমন জমিতে বসবাস বা চাষাবাদ করছেন, যা আইনি দৃষ্টিতে ভারতের অংশ হতে পারে, আবার উল্টো ঘটনাও রয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের এই তাৎক্ষণিক মন্তব্য নেপালের জন্য কূটনৈতিকভাবে সমস্যার কারণ হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ভারত-নেপাল সীমান্ত আলোচনা শুরু হলে নেপালি আলোচকদের এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে এবং তা আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে কালাপানি, লিপুলেখ ও লিম্পিয়াধুরা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে।
