বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করাই এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য: অর্থমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার ‘নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে একটি ‘নিয়ন্ত্রণমুক্ত অর্থনীতি’ গড়াই এবারের বাজেটের মূল উদ্দেশ্য। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে অপ্রয়োজনীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও বাজারভিত্তিক নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি বা অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ গড়ে তোলা।
মঙ্গলবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হবে। সে সঙ্গে এর বিকাশে কাজ করা হবে। এটা কেউ বাধাগ্রস্ত করতে চাইলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না।
আমীর খসরু বলেন, দেশে গ্রামের অনেক মানুষ ও নারী কাজ করলেও বাজেটে তাদের যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ফলে তারা ন্যূনতম জীবিকায়ও পিছিয়ে পড়ছে। এ কারণে সরকার প্রাইভেট সেক্টর ও এনজিও’র মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, জিডিপি শুধু শিল্প কারখানা থেকে আসে; এ ধারণা সঠিক নয়। ক্রিয়েটিভ সেক্টরকেও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ সবসময়ই বাজেটে বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় দারিদ্র্য আরও বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কৃষক ও সৃজনশীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ক্ষমতায়ন করা এবং বেসরকারি খাতের জন্য নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ তৈরি করাকেও বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে দরিদ্র মানুষের সুরক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও সৃজনশীল অর্থনীতির পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও শক্তিশালী করা হবে। কারণ, অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার মূল চালিকাশক্তি সরকার নয়, বেসরকারি খাত।

তিনি আরও বলেন, সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু, আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করার মতো হয়ে গেছে। আমরা সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।

বাজেট তো অপেক্ষা করবে না উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, জুন মাসে বাজেট দিতেই হবে। তাই অত্যন্ত ধৈর্য, পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে আমরা কাজ করেছি। ঘুমানোর সময় ছাড়া সবাই প্রায় সারাক্ষণ কাজ করছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা একটি ভালো বাজেট দেয়ার চেষ্টা করেছি।

ব্যবসা-বাণিজ্যে হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে অর্থমন্ত্রী বলেন, নাগরিক কিংবা উদ্যোক্তাদের কোনো সেবার জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হবে না। মিউটেশন, লাইসেন্স, বিদ্যুৎ সংযোগ, পাসপোর্ট যে সেবাই হোক না কেন, সবকিছু নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

তিনি জানান, কোনো সেবার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন লাগলেও আবেদনকারীকে বারবার বিভিন্ন অফিসে যেতে হবে না। একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে আবেদন করলেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। যদি কেউ নির্ধারিত সময়ে সাড়া না দেয়, তাহলে মানুষকে আর অপেক্ষা করতে হবে না। অটো অনুমোদন হয়ে যাবে। আমরা কোনো ধরনের হয়রানি চাই না। নাগরিকের জীবন সহজ করা সরকারের দায়িত্ব।
জিডিপি নিয়ে প্রচলিত ধারণার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, শিল্প-কারখানাই শুধু জিডিপি’র উৎস নয়। মানুষ যে টাকা খরচ করে সেটাই জিডিপি। থিয়েটারের টিকিট কিনলেও জিডিপি, খেলা দেখতে গিয়ে টিকিট কাটলেও জিডিপি। উন্নত দেশগুলোতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান বিশাল। তাই আমাদেরও জিডিপি সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের লুটপাট ও অনিয়মের কারণে দেশের অনেক ব্যাংক বর্তমানে আন্ডার-ক্যাপিটালাইজড অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে বহু বিনিয়োগকারীও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধনীকরণ করা এবং বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় কার্যকর মূলধন সরবরাহ করা।
শেয়ারবাজার নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে আমরা সম্পূর্ণরূপে নতুনভাবে সাজাচ্ছি। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি দেখতে পারবেন। এখানে পুরোপুরি প্রফেশনাল লোকদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক অংশগ্রহণ রাখা হয়নি।

এমনকি কোনো রাজনীতিকের সুপারিশও নেয়া হয়নি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সমপ্রসারণমূলক রাজস্বনীতি ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি দৌলত আকতার মালা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বিটিএমএ’র সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এবং ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন