সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই কি বিটিভিতে লুটপাটের উৎসব?

সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই কি বিটিভিতে লুটপাটের উৎসব?

ফন্ট সাইজ:

একসময় সন্ধ্যা নামলেই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যেতো। পরিবারের সবাই টেলিভিশনের সামনে বসতো, আর পর্দা জুড়ে ভেসে উঠতো রাষ্ট্রীয় সমপ্রচার মাধ্যম-এর অনুষ্ঠান। বিটিভি তখন কেবল একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না; এটি ছিল জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম প্রধান বাহক। ‘আনন্দমেলা’, ‘ইত্যাদি’, ঈদের নাটক, দেশাত্মবোধক গান কিংবা বিশেষ আয়োজন ঘিরে মানুষের আবেগ ছিল অন্যরকম। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় সেই বিটিভিই আজ দুর্নীতি, অনিয়ম, আর্থিক লুটপাট, দলীয়করণ এবং জবাবদিহিহীনতার ভয়াবহ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান জনগণের সাংস্কৃতিক বিকাশের দায়িত্ব পালন করবে, সেই প্রতিষ্ঠানই আজ জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত।

সামপ্রতিক ঈদ আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিটিভি’র বিরুদ্ধে যে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, তা শুধু বিস্ময়কর নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও সুশাসনের জন্য গভীর অশনিসংকেত। ঈদের দিন প্রচারিত ‘ঈদ আনন্দমেলা’ নামের মাত্র ৫০ মিনিটের একটি অনুষ্ঠানে শিল্পী সম্মানী বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে অনুষ্ঠানটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৫০ মিনিট। কিন্তু কাগজে-কলমে সেটিকে দেখানো হয়েছে ২০০ মিনিটের অনুষ্ঠান হিসেবে। উদ্দেশ্য একটাই-বিল বাড়ানো, সম্মানী বাড়ানো এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের পথ তৈরি করা।

প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি নিছক প্রশাসনিক ভুল? নাকি এটি পরিকল্পিত আর্থিক জালিয়াতি? বাংলাদেশের অধিকাংশ বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের পুরো বছরের বিশেষ অনুষ্ঠান নির্মাণ বাজেট যেখানে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে বিটিভি’র একটিমাত্র অনুষ্ঠানে শুধু শিল্পী সম্মানী বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ টাকা। এই তুলনাই প্রমাণ করে, এখানে মূল লক্ষ্য অনুষ্ঠান নির্মাণ নয়; বরং সরকারি অর্থ লুটপাটের বৈধ পথ তৈরি করা। বিটিভিতে যারা বসে আছেন, তাদের অনেকেই যেন দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করার জন্য দায়িত্বে আছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- এই অপচয় এমন একটি প্রতিষ্ঠানে ঘটছে, যেটি বছরের পর বছর লোকসানে চলছে এবং যার দর্শকসংখ্যা ক্রমাগত কমছে।

মানুষ এখন ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফরম এবং বেসরকারি টেলিভিশনের দিকে ঝুঁকছে। অথচ দর্শকহীন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠছে। ঈদের এই আলোচিত অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হিসেবে ছিলেন আওয়ামীপন্থি অভিনেতা। স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের জন্য দেয়া হয়েছে ৫৯ হাজার ১২৫ টাকা। আবার নৃত্যনাট্যের নামে অতিরিক্ত এক লাখ ৬৩ হাজার ৬০ টাকাও নিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ একই অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তির নামে একাধিক খাতে আলাদা বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এটি কেবল অনিয়ম নয়; এটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির স্পষ্ট আলামত। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করেও শিল্পী রুনা লায়লার স্বামী অভিনেতা আলমগীরের নামে ১ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা সম্মানী দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগীতশিল্পী রুনা লায়লাকে তিন লাখ টাকা দেয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রীর নামে আলাদা বিল করা হয়েছে। এটি নিছক অনৈতিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের কৌশলী পদ্ধতি। নৃত্যশিল্পীর সম্মানী দেখানো হয়েছে ৬৭ হাজার টাকা।

আবার একই অনুষ্ঠানে নৃত্যনাট্যের জন্য আরও এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। শিল্পী পেয়েছেন দুই লাখ ২২ হাজার ২০০ টাকা। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এই সম্মানী নির্ধারণের নীতিমালা কোথায়? কোন কমিটি এই ব্যয় অনুমোদন দিয়েছে? কোনো আর্থিক নিরীক্ষা হয়েছে? জনগণের টাকায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এত বড় অঙ্কের অর্থ কীভাবে এত সহজে বিতরণ করা হলো? বিটিভি’র একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখনো এমন ব্যক্তিরা বহাল আছেন, যারা অতীতের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুবিধাভোগী ছিলেন। তারাই অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, শিল্পী নির্বাচন এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণ করছেন।

ফলে বিটিভি কার্যত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর আর্থিক স্বার্থ রক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে অজনপ্রিয় করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই লুটপাটের ঘটনা ঘটানো হয়েছে কি না? এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে আমি মনে করি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বিটিভি’র দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল, অতিরিক্ত সম্মানী, নিয়োগ বাণিজ্য ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তও হয়েছে অসংখ্যবার।

কিন্তু শাস্তির কোনো দৃশ্যমান নজির নেই। যেন তদন্ত কেবল জনগণের ক্ষোভ সাময়িকভাবে প্রশমিত করার একটি নাটকীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মাত্র। এই সংস্কৃতিই আজ বিটিভিকে একটি গভীরভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে। যেখানে যোগ্যতা নয়, সততা নয়, দর্শকের চাহিদাও নয় বরং রাজনৈতিক আনুগত্য, সিন্ডিকেট এবং অর্থ ভাগাভাগির সমীকরণই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: [email protected]
চলবে-

ট্যাগসমূহ:

Chowdhury

১ মাস আগে

আবার নৃত্যনাট্যের নামে অতিরিক্ত এক লাখ ৬৩ হাজার ৬০ টাকাও নিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ একই অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তির নামে একাধিক খাতে আলাদা বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এটি কেবল অনিয়ম নয়; এটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির স্পষ্ট আলামত। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করেও শিল্পী রুনা লায়লার স্বামী অভিনেতা আলমগীরের নামে ১ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা সম্মানী দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগীতশিল্পী রুনা লায়লাকে তিন লাখ টাকা দেয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রীর নামে আলাদা বিল করা হয়েছে। এটি নিছক অনৈতিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের কৌশলী পদ্ধতি। নৃত্যশিল্পীর সম্মানী দেখানো হয়েছে ৬৭ হাজার টাকা।

Salim Ahmed Jico

১ মাস আগে

সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দ্রুত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

মন্তব্য করুন