নেত্রকোণার সদর উপজেলার চল্লিশা এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মা ও দুই মেয়েসহ ইজিবাইক চালক নিহত হওয়ার ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে আমলি কেশবপুর গ্রাম। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন নিহতদের স্বামী ও পিতা আইনাল হক (৫৫)। তবে আর্থিক সংকটের কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। গত রোববার নেত্রকোণা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চল্লিশা বাইপাস এলাকায় রুবি এন্টারপ্রাইজের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- সদর উপজেলার আমলি কেশবপুর গ্রামের আইনাল হকের স্ত্রী নূর জাহান (৫০), তার মেয়ে স্মৃতি আক্তার (১৮), ইতি আক্তার (১২) এবং পাশের কাঞ্চনপুর গ্রামের ইজিবাইক চালক রায়হান মিয়া (৪০)।
দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই স্মৃতি আক্তারের মৃত্যু হয়। পরে নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালে নূরজাহান ও ইতি আক্তারকে মৃত ঘোষণা করা হয়। বিকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রায়হান মিয়ার মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত আইনাল হকের চিকিৎসা চলছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করলেও আর্থিক সংকটের কারণে সেখানে নেয়া সম্ভব হয়নি। একই দুর্ঘটনায় আহত হৃদয় (৪০) ও মুস্তাকিম (২৮) ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্ত্রী, দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান নিয়ে ছিল দিনমজুর আইনাল হকের সংসার। জীবিকার তাগিদে কয়েক বছর ধরে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গাজীপুরের বাঘের বাজার এলাকায় বসবাস করতেন। নিহত স্মৃতি আক্তার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। আইনাল হক ও তার ছেলে নুর জামাল দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ঈদুল আজহার ছুটিতে সপরিবারে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন তারা। ঘটনার দিন একই উপজেলার হিরণপুর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হিরণপুর যাওয়ার পথেই বাসের সঙ্গে ইজিবাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায় আইনাল হকের সংসার। দুর্ঘটনার পর প্রশাসন রোববার সন্ধ্যায় নিহত নূরজাহান, স্মৃতি ও ইতির মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে।
পরে রাতেই পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। সোমবার আমলি কেশবপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। আইনাল হকের জরাজীর্ণ বাড়ির সামনে স্বজনরা নির্বাক হয়ে বসে আছেন। একমাত্র ছেলে নুর জামাল বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নূরজাহান ও তার দুই মেয়ের মৃত্যুর খবরে পুরো গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আইনাল হক বর্তমানে হাসপাতালের বেডে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আইনাল হকের বোন ফিরোজা বেগম জানান, চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত ইজিবাইক চালক রায়হান মিয়ার মরদেহ সোমবার সকালে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে গেছেন।
ঘটনার দিন বিকালে নিহতদের বাড়িতে ছুটে যান নেত্রকোণা-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আনোয়ারুল হক। তিনি নিহত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হলেও জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকিউল বারি বলেন, নিহতদের পরিবার আবেদন করলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। নিহতদের স্বজনরা জানান, আইনাল হকের ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই।
স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হারিয়ে তিনি এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আত্মীয়স্বজন মিলে তার চিকিৎসার ব্যয় বহনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আইনাল হকের চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা।
এদিকে নিহত ও আহতদের পারিবারিক অর্থ সংকটের কথা সাংবাদিকদের কাছে জানতে পেরে বিনামূল্যে আইনাল হকের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ তথ্য জানিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. ইফতেখার হায়দার। তিনি বলেন, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
নেত্রকোণা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল মামুন সরকার জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি জব্দ করা হয়েছে।
