একটা সময় ছিল, বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার এক মাস আগ থেকেই বাংলাদেশের আকাশ বদলে যেত। গ্রামের মেঠোপথ থেকে শুরু করে শহরের বহুতল ভবনের ছাদ—সবখানেই উড়ত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা ইতালির পতাকা। কোথাও বাঁশের খুঁটিতে বিশালাকার ব্যানার, কোথাও আবার পুরো বাড়ি রঙ করা হতো প্রিয় দলের জার্সির আদলে। রাতভর চলত তর্ক-বিতর্ক, চায়ের দোকানে জমত উত্তপ্ত আলোচনা, বাজি ধরা নিয়ে বন্ধুত্বে অভিমানও হতো। বিশ্বকাপ যেন শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল বাঙালির আবেগ, আনন্দ এবং সাময়িকভাবে দুঃখ ভুলে থাকার এক মহোৎসব।
কিন্তু আজ সেই উন্মাদনা কোথায়?
আর মাত্র কয়েকদিন পর বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা উঠবে, অথচ বাংলাদেশের অলিগলি, ছাদ, বাজার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই চেনা উত্তেজনা চোখে পড়ছে না। নেই পতাকার ঝড়, নেই রাতভর হৈচৈ, নেই সেই উন্মাতাল প্রতীক্ষা। ফুটবলপ্রেমী জাতি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ যেন এবার অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততায় ডুবে আছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াকে দায়ী করলে ভুল হবে। বাস্তবতা হলো—বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্যের চাপ মানুষের জীবনকে এতটাই বিপর্যস্ত করেছে যে ফুটবলের উচ্ছ্বাস এখন অনেকের কাছেই বিলাসিতা মনে হচ্ছে।
বিশ্বকাপ সবসময়ই বিশ্বমানবতার মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। সেখানে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ আনন্দ ভাগাভাগি করবে—এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সমর্থন করেছেন। কারণ যুদ্ধ কখনোই মানবতার পক্ষে নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একই মানদণ্ড কি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? যদি যুদ্ধ, আগ্রাসন কিংবা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণে কোনো দেশকে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও কি সেই একই নীতি কার্যকর হচ্ছে?
আসল বিতর্কের শুরু এখানেই। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক হস্তক্ষেপ, মধ্যপ্রাচ্যে আগ্রাসী নীতি এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে—আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার কি সত্যিই সবার জন্য সমান?
বিশ্বের বহু মানুষ মনে করেন, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় নরম অবস্থান নেয়। আর দুর্বল বা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কঠোরতা দেখায়। ফলে “আইনের শাসন” নয়, বরং “শক্তির শাসন”—এই ধারণাটিই বারবার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
কারণ, যে অপরাধে রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃত সেই একই অপরাধ করে আমেরিকা বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক! এর চেয়ে নগ্ন বৈষম্যের ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে আর কয়টা আছে?
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার বিভিন্ন বক্তব্য, একতরফা সিদ্ধান্ত এবং আক্রমণাত্মক কূটনৈতিক আচরণ বিশ্ব রাজনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, ইরানকে ঘিরে কঠোর অবস্থান, বাণিজ্যযুদ্ধ কিংবা সামরিক হুমকি—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি আজ ভঙ্গুর এক বাস্তবতার মুখোমুখি।
যুদ্ধ মানেই তেলের দাম বৃদ্ধি। যুদ্ধ মানেই খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। যুদ্ধ মানেই পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংকট এবং মানুষের নিত্যদিনের জীবনে অসহনীয় চাপ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষ সেই অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করে।
আজ একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজারে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দেখে মানুষ আতঙ্কিত হয়। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে যে পরিবার একসময় বিশ্বকাপ উপলক্ষে নতুন জার্সি কিনত, ছাদে পতাকা তুলত, বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করত—সেই পরিবার আজ হিসাব করছে মাস শেষে চাল-ডাল কেনার টাকা থাকবে কি না।
এই বাস্তবতায় ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা অনেকের কাছেই গৌণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম আসলে এক বিস্ময়। যে দেশে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ কখনো তৈরি হয়নি, সেই দেশের মানুষ বিশ্বকাপকে নিজেদের উৎসবে পরিণত করেছে। লাতিন আমেরিকার হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দেশের জয়েও এ দেশের মানুষ আনন্দে কেঁদেছে। আবার পরাজয়ে ভেঙে পড়েছে। এটি কেবল খেলার প্রতি ভালোবাসা নয়; এটি আবেগের এক অনন্য সামাজিক সংস্কৃতি।
কিন্তু সেই সংস্কৃতিও এখন বৈশ্বিক অস্থিরতার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত। আগে মানুষ বিশ্বকাপকে দেখত আনন্দের অবকাশ হিসেবে। জীবনের চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক সংকট ভুলে কিছুদিন আনন্দ করার উপলক্ষ হিসেবে। কিন্তু এখন বাস্তবতা এতটাই নির্মম যে আনন্দ উপভোগ করার মানসিক অবকাশও মানুষের নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই যুদ্ধ, ধ্বংস, মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক সংঘাত আর অনিশ্চয়তার খবর। মানুষের মন ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন এবং অবসন্ন।
বিশ্বকাপের আবেগও তাই যেন বাস্তবতার ভারে চাপা পড়ে গেছে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—খেলাধুলাও আজ পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে নেই। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলো নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোথাও মানবাধিকার ইস্যুতে কঠোরতা, কোথাও আবার নীরবতা। ফলে সাধারণ দর্শকের মনেও এক ধরনের হতাশা জন্ম নিচ্ছে। মানুষ ভাবছে—খেলাও কি তাহলে শক্তির রাজনীতির বাইরে নয়?
“জোর যার মুল্লুক তার”—এই পুরোনো প্রবাদ যেন আজও বিশ্বব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা হয়ে আছে। প্রযুক্তিতে, পোশাকে, স্থাপত্যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পৃথিবী হয়তো অনেক আধুনিক হয়েছে। কিন্তু মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং সমতার প্রশ্নে আমরা কতটা এগিয়েছি?
এই প্রশ্ন এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। বিশ্বকাপ ফুটবল একসময় মানুষকে এক করত। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ কিংবা রাজনীতির ভেদাভেদ ভুলিয়ে দিত। কিন্তু আজ বিশ্বজুড়ে বিভাজন এত গভীর যে সেই ঐক্যের অনুভূতিও অনেক ক্ষেত্রে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন আনন্দ করার আগেই ভাবছে ভবিষ্যৎ নিয়ে, চাকরি নিয়ে, সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে, দ্রব্যমূল্য নিয়ে।
বাংলাদেশের ফুটবলপাগল তরুণদের মাঝেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। আগে যারা রাত জেগে প্রিয় দলের পোস্টার বানাত, এখন তারা চাকরি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আগে যাদের কাছে বিশ্বকাপ ছিল উৎসব, এখন তাদের কাছে জীবনটাই সংগ্রাম।
তবে এটাও সত্য যে,মানুষ শেষ পর্যন্ত আনন্দ খুঁজে নিতে চায়। যুদ্ধ, সংকট কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা কখনোই মানুষের চিরন্তন স্বপ্নকে পুরোপুরি নিভিয়ে দিতে পারে না। হয়তো এবারের বিশ্বকাপে সেই আগের মতো পতাকার জোয়ার দেখা যাবে না, হয়তো রঙিন উন্মাদনা কিছুটা কম হবে, তবুও খেলা শুরু হলে বাংলাদেশের কোটি মানুষ আবারও টেলিভিশনের সামনে বসবে। কোনো গোলের পর আবারও উল্লাস হবে, কোনো হারের পর মন খারাপ হবে। কারণ ফুটবল শুধু খেলা নয়; এটি মানুষের আবেগ, কল্পনা এবং সাময়িকভাবে সব কষ্ট ভুলে থাকার এক আশ্রয়।
কিন্তু সেই আনন্দকে স্থায়ী করতে হলে বিশ্বকে আরও মানবিক হতে হবে। শক্তির অহংকার নয়, দরকার ন্যায়বিচার। যুদ্ধ নয়, দরকার শান্তি। দ্বৈতনীতি নয়, দরকার সমতা। কারণ পৃথিবীর এক প্রান্তের যুদ্ধ অন্য প্রান্তের মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত প্রভাব ফেলে। আর যখন মানুষের পেটের ভাত অনিশ্চিত হয়ে যায়, তখন উৎসবের রঙও ফিকে হয়ে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাস হারিয়ে যাওয়ার গল্প শুধু ফুটবলের গল্প নয়; এটি আজকের অস্থির পৃথিবীর গল্প। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষ আনন্দ করতে চাইলেও বাস্তবতা তাকে বারবার পেছন টেনে ধরে। তবু আশা করি, একদিন আবার বাংলাদেশের আকাশ রঙিন পতাকায় ভরে উঠবে। আবার ছাদে ছাদে বাজবে বিজয়ের গান। আবার মানুষ যুদ্ধ আর মূল্যবৃদ্ধির ভয় ভুলে মেতে উঠবে ফুটবলের আনন্দে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
