প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী ইউরোসেটরিতে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের নিষিদ্ধ করল ফ্রান্স

প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী ইউরোসেটরিতে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের নিষিদ্ধ করল ফ্রান্স

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদর্শনী ‘ইউরোসেটরি ২০২৬’-এ ইসরাইলের সরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে ফ্রান্স। একই সঙ্গে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে তারা কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক অস্ত্র বা হামলা সক্ষম সামরিক ব্যবস্থা প্রদর্শন করতে পারবে না।

সোমবার ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। তাদের দাবি, ফরাসি সরকার ইসরাইলি সরকারি প্রতিনিধিদের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং জাতীয় প্যাভিলিয়ন স্থাপনের অনুমতি দেয়নি। অংশগ্রহণকারী ইসরাইলি কোম্পানিগুলোকে শুধু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত প্রযুক্তি প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এ সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রদর্শনী-সংক্রান্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্যারিস ও তেলআবিবের মধ্যে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রতিফলন।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধ নিয়ে ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের সমালোচনা, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের অবস্থানগত পার্থক্য এই সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সম্প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে ওঠে। একই সময়ে লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান নিয়েও প্যারিস প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে।

এই সিদ্ধান্তের মাত্র কয়েকদিন আগে ইসরাইলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে ফ্রান্সে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো ঘোষণা দেন যে, ফরাসি ও ইউরোপীয় নাগরিকদের সঙ্গে বেন-গভিরের অগ্রহণযোগ্য আচরণের কারণে তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত হয় গাজাগামী একটি মানবিক সহায়তা বহনকারী ফ্লোটিলা আটক হওয়ার পর প্রকাশিত একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। ভিডিওটিতে হাত ও চোখ বাঁধা কয়েকজন ইউরোপীয় কর্মীকে মাটিতে বসিয়ে রাখা অবস্থায় দেখা যায় এবং তাদের সামনে বেন-গভিরকে ব্যঙ্গাত্মক আচরণ করতে দেখা যায়। ভিডিওটি ইউরোপজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নেতা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এদিকে ফরাসি সরকার ফ্লোটিলায় থাকা ফরাসি নাগরিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের জন্য রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলিকে তদন্ত শুরুর অনুরোধ জানিয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, অপমানজনক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ও রয়েছে।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ফ্রান্সের সর্বশেষ সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ও বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, ইউরোসেটরির মতো আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ইসরাইলকে টার্গেট করে পৃথক বিধিনিষেধ আরোপ গ্রহণযোগ্য নয়।
চলতি মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠ ভিলপিন্তে অনুষ্ঠিতব্য ইউরোসেটরি প্রদর্শনীতে ২,৬০০-এর বেশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীগুলোর একটি, যেখানে বিভিন্ন দেশের সরকার, সামরিক বাহিনী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউরোসেটরিকে ঘিরে ফরাসি সরকারের এই পদক্ষেপ শুধু একটি প্রদর্শনী-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ফ্রান্সের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন