জিদানের ছেলে কেন আলজেরিয়ায়

আর বাকি ৯ দিন

জিদানের ছেলে কেন আলজেরিয়ায়

ফন্ট সাইজ:

জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। তর্কসাপেক্ষে ফুটবল ইতিহাসের সেরাদের একজন। খেলোয়াড় জিদানের মাহাত্ম অজানা নয় কারোরই। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে হেডের সেই আইকনিক জোড়া গোল থেকে শুরু করে ২০০৬ বিশ্বকাপে মার্কো মাতেরেজ্জিকে দেয়া ঢুস-বিশ্বমঞ্চে খুব আলোচিত ছিলেন ফ্রান্সের এ কিংবদন্তি মিডফিল্ডার। পরে কোচ হিসেবেও রিয়াল মাদ্রিদকে দুহাত ভরে দিয়েছেন জিদান। সেই ফরাসি কিংবদন্তির ছেলে লুকা জিদান এবার বিশ্বকাপ মাতাবেন আলজেরিয়ার জার্সি গায়ে। আলজেরিয়ানদের ঘোষিত বিশ্বকাপ দলে জায়গাও পেয়েছেন লুকা। কীভাবে সম্ভব হলো এই ‘পরিবর্তন’?

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এক পরিবারের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জিদানের চার পুত্র এনজো, লুকা, থিও এবং এলিয়াজ ফুটবলকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং প্রত্যেকেই বড় হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের বিখ্যাত একাডেমি ‘লা ফাব্রিকা’-তে। বর্তমানে তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু বড় ছেলে এনজো। তিনি পেশাদার ফুটবলের পাঠ চুকিয়ে পারিবারিক এবং নিজের ব্যবসা সামলাচ্ছেন। লুকা গোলকিপার, এবং ছোট দুজনও স্পেনের পেশাদার ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত। যেখানে জিদান ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ও ২০০০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্সকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিয়ে নিজেকে ফরাসি ফুটবলের অবিসংবাদিত নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে তার দ্বিতীয় পুত্র হেঁটেছেন উল্টো পথে। নিজের আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে লুকা বেছে নিয়েছেন তার দাদা-দাদির জন্মভূমি আলজেরিয়াকে। মনে হতে পারে, ফরাসি ফুটবলের চাপ থেকে বাঁচার উপায় হিসেবেই তুলনামূলক ছোট দল আলজেরিয়াকে বেছে নিয়েছেন লুকা। তবে এটি তেমন গল্প নয়। এটি ছিল লুকার পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।

আলজেরিয়াকে বেছে নেয়ার মূল অনুপ্রেরণা যে তার দাদা, সে বিষয়ে আগেই গণমাধ্যমে খোলামেলা কথা বলেছেন লুকা। স্প্যানিশ ক্লাব গ্রানাডার ২৮ বছর বয়সী ফুটবলার লুকা বলেন, ‘আমি যখনই আলজেরিয়ার কথা ভাবি, আমার দাদার মুখ ভেসে ওঠে। শৈশব থেকেই আমাদের পরিবারে আলজেরিয়ান সংস্কৃতির এক গভীর প্রভাব রয়েছে। জাতীয় দলে যোগ দেয়ার আগে আমি দাদার সঙ্গে কথা বলি। আমার এই সিদ্ধান্তে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। এখন প্রতিবার যখন আমি জাতীয় দলে ডাক পাই, তিনি আমাকে ফোন করে বলেন যে আমি জীবনের অন্যতম সেরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং তিনি আমাকে নিয়ে গর্বিত।’

ফ্রান্সের হয়ে মূল জাতীয় দলে অভিষেক না হওয়ায় ফিফার নিয়মানুযায়ী আলজেরিয়ার হয়ে খেলার পূর্ণ যোগ্যতা ছিল লুকার। গত বছরের ১৯শে সেপ্টেম্বর ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে তার এই জাতীয়তা পরিবর্তনের আবেদন মঞ্জুর করে। এতদিন বাবার নামের সঙ্গে তুলনা এড়াতে ক্লাবের জার্সিতে শুধু ‘লুকা’ নামটি ব্যবহার করলেও, আলজেরিয়া জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি সগৌরবে ধারণ করছেন তাদের পারিবারিক নাম- জিদান। আলজেরিয়ার জার্সি হাতে নিয়ে লুকা আবেগাপ্লুত লুকা বলেন, ‘জাতীয় দলে যোগ দিয়ে দাদাকে সম্মানিত করতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই নামাঙ্কিত আগামী জার্সিটি আমি তাকেই উৎসর্গ করবো।’

জিনেদিন জিদান ফ্রান্সের জাতীয় নায়ক হওয়া সত্ত্বেও, পুত্রের এই সিদ্ধান্তে কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি। বাবার সমর্থনের কথা উল্লেখ করে লুকা বলেন, ‘‘বাবা আমাকে সম্পূর্ণ সমর্থন জুগিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সতর্ক থেকো, এটি সম্পূর্ণ তোমার নিজের পছন্দ। আমি তোমাকে পরামর্শ দিতে পারি, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে।’ আলজেরিয়ান কোচ এবং ফেডারেশন সভাপতি যখন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখনই আমার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আমি আমার পিতৃভূমির প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।”

দলে জিদান নামের আগমন নিয়ে আলজেরিয়া দলের অধিনায়ক তথা ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক তারকা রিয়াদ মাহরেজ বলেন, “লুকা দলের আর দশটা সাধারণ খেলোয়াড়ের মতোই। সে খুব দ্রুত মানিয়ে নিয়েছে এবং দলের জন্য নিজের সেরাটা দিচ্ছে। তবে হ্যাঁ, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে তার ‘জিদান’ পদবীটির একটি আলাদা ওজন রয়েছে।”
আলজেরিয়া দলে যোগ দিয়েই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন লুকা। দীর্ঘ এক দশক ধরে আলজেরিয়ার গোলপোস্ট সামলানো রাইস এমবোলহির অবসরের পর দলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, লুকা তা দারুণভাবে পূরণ করছেন। গত বছরের শেষে আফ্রিকান কাপ অব ন্যাশনসে (অ্যাফকন) সুদানের বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে আলজেরিয়ার গোলবার অক্ষত রেখে নিজের অভিষেক রাঙান তিনি।

এবার লুকার সামনে অপেক্ষা করছে বিশ্ব ফুটবলের মহোৎসব। সমপ্রতি স্প্যানিশ লা লিগায় গ্রানাডার হয়ে খেলার সময় মাথায় আঘাত পান এবং চোয়ালের হাড় ভেঙে যায়। আপাতত সেরে উঠছেন তিনি। তবুও আলজেরিয়ার প্রধান কোচ ভ্‌লাদিমির পেটকোভিচ তাকে আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আগামী ১৬ জুন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে আলজেরিয়া তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। গ্রুপ ‘জে’-তে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। চিকিৎসকদের সবুজ সংকেত পেলে মহাতারকা রিয়াদ মাহরেজ, রামি বেনসেবাইনিদের সঙ্গে লুকাও নামবেন বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন