নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় যেতে চাইছে সরকার। মুখস্থ বিদ্যাকে পাস কাটিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় জোর দেয়া হচ্ছে। পূর্বে বিভিন্ন কোর্স আনা হতো বা সমন্বয় করে পড়ানো হতো। কিন্তু এগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কার্যকর হতো কমই। বর্তমান সরকার ট্যাবলেটের সহায়তায় কোর্স নয় বিষয়কেন্দ্রিক পড়াশোনায় জোর দিচ্ছে। এসব ট্যাবলেট ব্যবহার করে বিষয়ভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষকরা পরিকল্পনা সাজাবেন এবং শিখবে শিশুরা। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির জন্য গুগলের কাছে সহায়তাও চেয়েছে সরকার।
ট্যাবলেট এডুকেশন বা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে মৌলিক শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি করেছে মালাউইসহ অনেক দরিদ্র দেশ। মালাউইতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছিল না ভিত্তি। সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, দুর্বল অবকাঠামোসহ দুর্নীতির কারণে শিক্ষাসামগ্রী শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া সম্ভব হতো না। এই সমস্যার সমাধানে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকনির্ভর ক্লাসের বদলে শিশুদের ট্যাবলেট কম্পিউটারের মাধ্যমে স্বশিক্ষণ করানো হয়। এসব ট্যাবলেট সৌরশক্তিতে চার্জ হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গণিত ও ভাষা শেখার সফটওয়্যার ব্যবহার করানো হয়। এ গবেষণার লক্ষ্য হলো, সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই শিশুদের মৌলিক শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যদিও ধারণাটি কিছুটা বিতর্কিত। ক্ষেত্র পরীক্ষায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু অগ্রগতি হয়। যেমন, স্বাহিলি ভাষায় পড়তে পারার হার ও মৌলিক গণিত দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে এই ট্যাবলেট এডুকেশন যেমন বেসিক শিক্ষার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, উল্টো পিঠে উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার ব্যবস্থার ধারণাই পরিবর্তন করেছে। চীনে এটি সব থেকে বেশি কার্যকর। সেখানে ট্যাবলেট শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং পুরো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ। তারা স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টিউটরিং ব্যবস্থা, অনলাইন হোমওয়ার্ক নজরদারি ব্যবস্থা, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে উপস্থিতি গ্রহণ, তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করে থাকে। যার কারণে চীনে গ্রামাঞ্চলেও শিক্ষার মান অনেক বেশি মানসম্মত হয়েছে।
এই শিক্ষাব্যবস্থায় বড় সুবিধা পেয়েছে যুক্তরাজ্য। পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ট্যাবলেট নির্ভর নয় বরং সমন্বিত শিক্ষা মডেল পরিচালনা করছে। তারা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় হালকা ল্যাপটপ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক পাঠদান করেন, বাড়িতে বা শ্রেণিকক্ষে অনলাইন কাজ দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা নিজের গতিতে শিখতে পারে। যেখানে থাকে ওপেন বুক এক্সাম। যেখানে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারে, সেখানে এমনভাবে পড়ানো বেসিক কিছু বিষয় ছাড়া শিক্ষার্থীরা যাতে মুখস্থ না করে। আর মুখস্থ করলেও যাতে লাভ না হয়। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নগুলো তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে মূলত ট্যাবলেট ও ল্যাপটপ ব্যবহার হয় সহায়ক হিসেবে। এসব দেশের পাশাপাশি সমন্বিত শিক্ষায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছে থাইল্যান্ড।
২০২৮ সালে আসছে নতুন কারিকুলাম। সেইসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আনতে চায় সমন্বয়কেন্দ্রিক ট্যাবলেট এডুকেশন। বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে তথ্য নেয়া ও বিশ্লেষণ করা হবে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনা করতে চায় সরকার। এর জন্য চাওয়া হয়েছে সহায়তা। বৃটেন সফরে আছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সম্প্রতি তিনি বৃটিশ কাউন্সিলের কর্মকর্তাবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে ইংরেজি পাঠ্যক্রম পরিমার্জন, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন জোরদার করা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি মাধ্যম পাঠ্যক্রমের মধ্যে আরও সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। আরেকটি সেশনে ‘গুগল ফর এডুকেশন’ প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক কলিন মারসন ও সলিউশনস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রধান অলি ট্রাসেল বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বিভিন্ন দেশের শিক্ষার উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহারকে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে গুগল কীভাবে কাজ করছে- এ বিষয়ে গুগলের কর্মকর্তারা শিক্ষামন্ত্রীকে অবহিত করেন। এ ছাড়াও, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ সরকার গৃহীত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে গুগল কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুগলের সহায়তার বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা হয়।
গতকাল আরেকটি সেশনে ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে, যাতে শিখন দক্ষতা কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতায় রূপান্তরিত হয়। আলোচনায় সক্ষমতা বৃদ্ধি হয় এবং অপব্যবহার রোধে ট্রানজিশনাল এডুকেশন (টিএনই)’র কার্যকর সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা করা হয়। উভয় পক্ষই বাংলাদেশের জাতীয় প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করার গুরুত্বের ওপর একমত হন।
সেশনের পর শিক্ষামন্ত্রী মূল বক্তা নাইজেরিয়ার এডো অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর মি. গডউইন ওবাসেকির সঙ্গে বৈঠক করেন। মি. ওবাসেকি এডো অঙ্গরাজ্যে বাস্তবায়িত ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাবলেট’ উদ্যোগের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ অঙ্গরাজ্যটিকে নাইজেরিয়ার অন্যতম সফল শিক্ষা অঙ্গরাজ্যে পরিণত করতে সহায়তা করেছে।
