দ্বিতীয় দফার ভোটে ট্রাম্প সমর্থকের প্রতিদ্বন্দ্বী বামপন্থী
বামে ইভান সেপেডা কাস্ত্রো, ডানে ট্রাম্প সমর্থক আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা

কলম্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

দ্বিতীয় দফার ভোটে ট্রাম্প সমর্থকের প্রতিদ্বন্দ্বী বামপন্থী

ফন্ট সাইজ:

কলম্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফায় ব্যর্থ হয়েছেন সব প্রার্থী। কোনো প্রার্থীই ক্ষমতালাভের জন্য প্রয়োজনীয় শতকরা ৫০ ভাগের বেশি ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ জন্য আগামী ২১ জুন দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দুই প্রার্থী বামপন্থী ইভান সেপেডা ক্যাস্ত্রো এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা লড়বেন। সিনেটর ইভান সেপেডা বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সমর্থক।

উভয় প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণায় সহিংসতা প্রাধান্য পেয়েছে। কলম্বিয়ায় ড্রোন হামলা, অপহরণ, খুন এবং প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর উপর হামলার মতো ঘটনাও রয়েছে। এসব ঘটনার কারণে সহিংসতাই কলম্বিয়ার প্রধান মাথাব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছে। মাদক চোরাকারবারিরা কলম্বিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্রমাগত সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনে লড়া উভয় প্রার্থীই সহিংসতা কমানোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলেছেন। রোববার প্রথম দফার ভোটের শেষে গণনা করে দেখা যায়, কোন প্রার্থীই ৫০ ভাগ সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হননি। ভোটের আগের জরিপগুলোতে বলা হয়েছিলো ইভান সেপেডা এগিয়ে আছেন। তবে ভোটের পর দেখা যায় বামপন্থী ইভান সেপেডা পেয়েছেন ৪১ ভাগ ভোট এবং এসপ্রিয়েলা পেয়েছেন ৪৩.৭ ভাগ। নির্বাচনে তৃতীয়স্থান লাভ করা পালোমা ভ্যালেন্সিয়া পেয়েছেন ৭ ভাগ ভোট।

দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের আগে তিনি দে লা এসপ্রিয়েলাকে সমর্থন জািনয়েছেন। ভোটে এগিয়ে থাকার পর এসপ্রিয়েলা বলেন, রানঅফে আমরা স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে জয়ী হবো। তিনি এটিকে ‘যারা কখনো রাষ্ট্রের স্তন্যপান করে বেঁচে থাকেনি’ সেই সকল জনগণের বিজয় বলে আখ্যা দেন। অন্যদিকে সেপেদা জানান, বিচারকদের মাধ্যমে ভোটের ফল যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো প্রাথমিক ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, লাখ লাখ ভোটে হেরফের করা হয়েছে। যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। তবে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।

সহিংসতার ছায়ায় নির্বাচন: নির্বাচনের প্রচারণাকালে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। যা কলম্বিয়ার সহিংসতাকেই আলোচ্য বিষয় করে তুলছে। কলম্বিয়ার কয়েক দশকের পুরোনো সশস্ত্র সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় দুই প্রার্থীর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেপেদা ২০১৬ সালে কলম্বিয়া সরকার ও গেরিলা গোষ্ঠী ফার্কের মধ্যে হওয়া ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট পেত্রোর টোটাল পিস বা সর্বাত্মক শান্তি নীতির অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত। এই নীতিতে সামরিক অভিযানের পরিবর্তে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার মাধ্যমে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। তবে সমালোচকদের মতে, পেত্রোর শাসনামলে কোকেন উৎপাদন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্যসংখ্যা বেড়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা তীব্র হয়েছে। যদিও সরকার দাবি করছে, তাদের আমলেই ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়েছে। সেপেদা নির্বাচিত হলে কল্যাণমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে জমি বণ্টনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কঠোর নিরাপত্তা নীতির প্রতিশ্রুতি এসপ্রিয়েলার: আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা একজন আইনজীবী ও ব্যবসায়ী। তিনি নিজেকে এল টাইগার বা বাঘ নামে পরিচয় দেন। প্রেসিডেন্ট পেত্রোর শান্তি আলোচনার নীতির কঠোর সমালোচক তিনি। এসপ্রিয়েলা অপরাধ দমনে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা, মাদক কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে বিমান হামলা এবং সেনাবাহিনীকে অধিক ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে। তিনি এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের আদলে জঙ্গলে ১০টি বৃহৎ কারাগার নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে অতীতে বিতর্কিত কিছু ব্যক্তির আইনজীবী হিসেবে কাজ করায় তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অ্যালেক্স সাব এবং বহুল আলোচিত পিরামিড স্কিম পরিচালনাকারী ডেভিড মুরসিয়া গুজমান।

যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক : আসন্ন রানঅফ নির্বাচনের ফল কলম্বিয়ার যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি লাতিন আমেরিকায় কঠোর নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছেন। যদিও তিনি কলম্বিয়ার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেননি, এসপ্রিয়েলা নিজেকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করেন। অন্যদিকে সেপেদা ও প্রেসিডেন্ট পেত্রো বরাবরই বলে আসছেন যে কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত রাষ্ট্র হতে পারে না।

এছাড়া প্রতিবেশী ইকুয়েডরের সঙ্গেও সম্পর্ক নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, এসপ্রিয়েলার সঙ্গে তার একটি সমঝোতা হয়েছে, যার আওতায় দুই দেশ যৌথভাবে মাদক চক্র ও সীমান্ত অপরাধ দমনে কাজ করবে এবং ইকুয়েডর কলম্বিয়ার ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার করবে। তবে কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নোবোয়ার এই মন্তব্যকে দেশটির নির্বাচনে ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আগামী ২১ জুনের রানঅফ ভোটে কলম্বিয়ার ভোটাররা দেশটির নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন