কুমিল্লা ইপিজেডের পরিবেশ বিপর্যয় রোধের দাবিতে কৃষক সমাবেশ

ফন্ট সাইজ:

কুমিল্লা ইপিজেডের বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে পরিবেশ দূষণ, কৃষিজমির ক্ষতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাবের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উদ্যোগে এক বিশাল কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। রোববার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর মহিলা কলেজ মাঠ সংলগ্ন তিন খালের সংযোগস্থল গুইঙ্গাজুড়ি খালের পাড়ে এ কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

কৃষক ঐক্য পরিষদের সভাপতি এডভোকেট আখতার হুসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। তিনি সমাবেশে যোগদানের আগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মনিরুল হক চৌধুরী।

সমাবেশে আবেগঘন বক্তব্য দিতে গিয়ে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মন্ত্রী মহোদয়, আমার এলাকার মানুষদের বাঁচান। প্রয়োজনে আমার এমপি পদ নিয়ে যান, তারপরও আমার এলাকার মানুষদের এই দুরবস্থা থেকে রক্ষা করুন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, আমি আপনাদের একটি কথা দিতে পারি। যেহেতু আমি নিজ চোখে পরিবেশের এই ভয়াবহ অবস্থা দেখেছি, এক সপ্তাহের মধ্যে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবো। যে ক্ষতি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি আর না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করবো। এই পানি যেন আর দূষিত না হয়, সেই দায়িত্বও নেবো। অতীতের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

তিনি বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান। সভাপতির বক্তব্যে এডভোকেট আখতার হুসাইন বলেন, যেমনিভাবে চীনের দুঃখ ছিল ওয়াং হো নদী, তেমনি কুমিল্লা দক্ষিণের দুঃখে পরিণত হয়েছে ইপিজেডের বর্জ্যে দূষিত নদী ও খালগুলো। আমাদের মাটি ও মানুষের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মনিরুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল এই এলাকার মানুষকে এ দুরবস্থা থেকে মুক্ত করা। সমাবেশে স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী ও বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা ইপিজেড থেকে নির্গত শিল্পবর্জ্য বিভিন্ন খাল, ছড়া ও জলাশয়ে মিশে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি করছে। এর ফলে মাছের উৎপাদন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষ চর্মরোগ, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চের সেক্রেটারি নাসির উদ্দীন বলেন, ইপিজেডের বর্জ্য এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশের গুইঙ্গাজুড়ি খাল আজ মাছ, সাপ ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য হারিয়ে ফেলেছে। একসময় মানুষ এখানে গোসল করতো, মাছ ধরতো।

এখন এই বিষাক্ত পানির সংস্পর্শে এলেই চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বারপাড়া ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি তুহিন মজুমদার বলেন, গুইঙ্গাজুড়ি খালের উপশাখা দক্ষিণ বিজয়পুর ছড়া খাল, বারপাড়া খাল, নোয়াপাড়া-হোসেনপুর খালসহ এলাকার প্রায় সব নদী-খাল আজ জীববৈচিত্র্য হারিয়েছে। একসময় এসব জলাশয় ছিল এলাকার মানুষের জীবিকা ও কৃষির প্রধান ভরসা।

চৌয়ারা ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি শামছুল আলম বলেন, ডাকাতিয়া, সোনাইছড়ি ও রুহিতা খাল একসময় এলাকার কৃষির প্রাণ ছিল। শত শত বছর ধরে কৃষকরা এসব খালের পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিতেন। এখন খালগুলোর পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ায় কৃষিকাজ এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন হুমকির মুখে পড়েছে। এ সময় কৃষক সমবায় ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা শামসুল হকসহ বিভিন্ন বক্তা পরিবেশ দূষণ বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা কৃষক সমবায় ঐক্য পরিষদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সদর দক্ষিণ উপজেলা ও মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সমাবেশ শেষে পরিবেশমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে স্থানীয়দের অভিযোগ ও দাবিগুলো শোনেন এবং বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই পরিবেশ বিপর্যয় রোধে এবার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের মানুষ ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার পাবেন।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন