বেইজিং দাবি করেছে জাপান নতুন সামরিকতাবাদের পথে হাঁটছে। তাদের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি। তিনি চীনের সামরিক সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছতার অভাবের সমালোচনা করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য প্রকৃত উদ্বেগের বিষয় হলো চীনের বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত একটি প্রতিরক্ষা সম্মেলনের শেষদিনে বক্তব্য দিতে গিয়ে কোইজুমি বলেন, চীনের বিপুল সামরিক শক্তি এবং অস্ত্রসজ্জাই বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে চীনের ধারাবাহিক সমালোচনার জবাবে টোকিওর পক্ষ থেকে এটা ছিল সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের চীন আক্রমণের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুর সম্মেলন শুরুর একদিন আগে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন সতর্ক করে বলেন, পুনরায় সামরিক শক্তিতে রূপ নেয়া জাপানের ‘ধূসর গণ্ডার’ দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জাপানের ‘নব্য সামরিকতাবাদ’ নিয়ন্ত্রণে একযোগে কাজ করার আহ্বানও জানান। ১২ বছর ধরে জাপান ধারাবাহিকভাবে তার প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে চলেছে। চলতি বছরের জন্য মন্ত্রিসভা অনুমোদিত বাজেট ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েনেরও বেশি, যা দেশটিকে সামরিক খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। তবে জাপান সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা যুদ্ধ চায় না; বরং নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করাই তাদের লক্ষ্য।
রোববার শাংরি-লা ডায়ালগে দেয়া বক্তৃতায় কোইজুমি বলেন, নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক শান্তিতে অবদান রাখতে জাপানসহ প্রতিটি দেশেরই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকীকরণ করা স্বাভাবিক বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের দখলদারিত্বের শিকার হওয়া কয়েকটি এশীয় দেশের কর্মকর্তাসহ উপস্থিত প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে তিনি বলেন, জাপান উচ্চ মাত্রার স্বচ্ছতা বজায় রেখে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা কেন এই সক্ষমতা গড়ে তুলছি? কোন চিন্তাধারার ভিত্তিতে তা করছি? জাপান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়েই এগিয়ে যাবে। কোইজুমি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন যে, জাপান কোনো নতুন সামরিকতাবাদে জড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, এটি সত্য থেকে অনেক দূরের কথা।
চীনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, একটি দেশ রয়েছে যার কাছে বিপুলসংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্র এবং কৌশলগত বোমারু বিমান রয়েছে। জাপানের কাছে এ ধরনের কোনো অস্ত্র নেই। তারপরও জাপানকে নতুন সামরিকতাবাদের তকমা দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি কি অদ্ভুত নয়? তার বক্তব্যের পর চীনা সামরিক বাহিনীর এক প্রতিনিধি প্রশ্ন করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের কাছে জাপান কি নতুন করে ক্ষমা চাইবে?
কোইজুমি সরাসরি সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আবারো চীনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, চীন উচ্চ হারে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে এবং পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছাড়াই দ্রুতগতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে। চীনের বৈদেশিক আচরণ এবং সামরিক কর্মকাণ্ড জাপান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য জাপানের দরজা সবসময় খোলা। যুদ্ধকালীন নৃশংসতার জন্য জাপানের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে চীন-জাপান সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল ইস্যু। অতীতে চীন কয়েকবার অভিযোগ করেছে যে, জাপানের কিছু ক্ষমা প্রার্থনা যথেষ্ট আন্তরিক ছিল না। শিনজিরো কোইজুমির পিতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমি দায়িত্বে থাকাকালে একাধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন। বাড়তি সামরিক বাজেটের আওতায় জাপান নতুন ভূমি থেকে জাহাজে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্থল ও পানির নিচে পরিচালিত ড্রোনে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি জাপান অস্ত্র রপ্তানির নিয়মও শিথিল করেছে, যার ফলে দেশটি অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র বিক্রি করতে পারবে। এই পদক্ষেপ জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নীতিমালাও সংশোধন করবে। তাকাইচি জাপানের সংবিধানের বহুল আলোচিত ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধনের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। এই অনুচ্ছেদটি যুদ্ধ পরিত্যাগ এবং শান্তিবাদী নীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। চীনের সঙ্গে উত্তেজনা গত নভেম্বরে আরও বেড়ে যায়, যখন তাকাইচি ইঙ্গিত দেন যে, চীন যদি তাইওয়ানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে জাপান তার আত্মরক্ষা বাহিনী ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তাকাইচির এসব পদক্ষেপ জাপানের ভেতরেও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একদল মানুষ মনে করেন, চীনের মতো সম্ভাব্য হুমকির মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া জাপান কি তার যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে কিনা, তা নিয়েও দেশ জুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। শান্তিবাদ দীর্ঘদিন ধরে জাপানের জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশ জুড়ে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সমাবেশ কয়েক দশকের মধ্যে জাপানের সবচেয়ে বড় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
