সন্ত্রাসের জনপদ জঙ্গল সলিমপুর

সন্ত্রাসের জনপদ জঙ্গল সলিমপুর

ফন্ট সাইজ:

দীর্ঘ আড়াই মাস শান্ত থাকার পর আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। এলাকায় আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রোববার মধ্যরাতে প্রায় ৩০০ সশস্ত্র সদস্য নিয়ে নবপ্রতিষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালায় সন্ত্রাসী ‘ইয়াসিন বাহিনী’। এ সময় যৌথ বাহিনীর সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে তীব্র প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় সন্ত্রাসীরা। পরে ১১ ঘণ্টাব্যাপী যৌথ অভিযানের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানিয়েছে র‍্যাব-৭। হামলার ঘটনায় ২৫ জনকে আটক করে।

গোয়েন্দা তথ্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩১শে মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জঙ্গল সলিমপুর সফরের কথা রয়েছে, যেখানে তার নবপ্রতিষ্ঠিত পুলিশ ক্যাম্প উদ্বোধন করার সূচি রয়েছে। এই সফর রুখে দিতে মূলত রোববার রাত ১২টার দিকে ‘ইয়াসিন বাহিনী’র প্রধান ইয়াসিনের সরাসরি নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী বুলডোজার নিয়ে ছিন্নমূল এলাকা থেকে আলীনগরের দিকে রওনা হয়। রাত ১টার দিকে বৃষ্টি শুরু হলে সেই সুযোগে সন্ত্রাসীরা অস্থায়ী ক্যাম্পের সীমানা দেয়াল ভেঙে হামলা চালায় এবং ককটেল বিস্ফোরণসহ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে র‍্যাবের কয়েকজন সদস্য সামান্য আহত হন। সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে পুলিশ সদস্যরা শর্টগান, চাইনিজ রাইফেল ও গ্যাস গান থেকে মোট ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোড়েন।

হামলার খবর পেয়ে রাত ৩টা থেকে জঙ্গল সলিমপুর ও এর আশপাশের এলাকায় যৌথ বাহিনীর বড় ধরনের চিরুনি অভিযান শুরু হয়। সেখানে যাওয়ার পথে চারটি স্থানে রাস্তা কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সন্ত্রাসীরা, ফলে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের হেঁটে দুর্গম এলাকায় প্রবেশ করতে হয়।

র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, রোববার রাত ২টার দিকে প্রায় ৩০০ সন্ত্রাসী অতর্কিতে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় র‍্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এবং বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভাঙচুর করে। ক্যাম্পে থাকা প্রায় ১৫০ র‍্যাব ও পুলিশ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। পরে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারেন, সেজন্য অন্তত চারটি স্থানে রাস্তা ও কালভার্ট কেটে দেয় হামলাকারীরা। ফলে সদস্যদের গাড়ি অনেক দূরে রেখে পায়ে হেঁটে ঘটনাস্থলে যেতে হয়।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত ২৫ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ‘সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন বাহিনী পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালিয়েছে। তবে অভিযানের একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য গুরুতর আহত হন। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, এই জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের একটা বড় স্বার্থের এবং ইন্টারেস্টের জায়গা। এগুলো প্রতিটা টাকার বিষয়। কোটি কোটি টাকার বিশাল এ সাম্রাজ্য যখন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তখন হাতছাড়া হওয়ার আগে তারা একটা ঝামেলার দিকে যাচ্ছে। তারা যতই ঝামেলার দিকে যাক, আমরা প্রতিহত করতে চেষ্টা করবো। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে অবস্থান করছে। সামনে প্রয়োজনে আরও বেশি পরিমাণে ফোর্স মোতায়েন করা হবে এবং সে অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। হামলার মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত ইয়াসিনের বিষয়ে এসপি মাসুদ আলম বলেন, এই ইয়াসিন নামের ব্যক্তিটি সম্প্রতি এখানে তৎপরতা শুরু করেছে। আমাদের মনে হচ্ছে, ওর ব্যাকগ্রাউন্ড বা ওর পেছনে কেউ থাকতে পারে।

এর আগে, গত ১৯শে জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় চট্টগ্রাম র‍্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক-ডিএডি (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এরপর ৯ই মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের আস্তানা নির্মূল এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। এতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের প্রায় ৪ হাজার সদস্য অংশ নেন। দীর্ঘ সময় ধরে ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে পরিচিত এই পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের সময় অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়া রুখতে জঙ্গল সলিমপুরের প্রতিটি প্রবেশ ও বাইরের পথ সিল করে দেয়া হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। এরপর জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশ এবং র‍্যাবের দু’টি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন