পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে এলেও নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর ঘরে নেই উৎসবের আমেজ। চলতি বোরো মৌসুমে বিএডিসি’র মিশ্রণ বীজ, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ১০ উপজেলায় প্রায় ৭৮ হাজার কৃষকের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চোখের সামনে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে হতাশায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকেরা।
শুধু বন্যাই নয়, বিএডিসি’র বি ধান-৮৮ মিশ্রণ বীজ নিয়েও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক কৃষক। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে মারাত্মকভাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু বোরো ধান নয়, সবজি, মাছ ও অন্যান্য ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। সব মিলিয়ে জেলার কৃষকদের মধ্যে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা।
ছিল বোরো ধান বিক্রি করে কোরবানির পশু কিনবেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। কিন্তু অকাল বন্যায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। কেন্দুয়া উপজেলার পানগাঁও গ্রামের কৃষক নুরু মিয়া জানান, অতিবৃষ্টিতে তার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কাটা জমির ধান নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ফিশারি পুকুরের মাছেও ভাইরাস ছড়িয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতি বছর কোরবানি দিই। এবারো ইচ্ছা আছে। কিন্তু কীভাবে দেবো, আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের খাবার কোনোভাবে জুটে যাবে, কিন্তু গরুগুলোর কী হবে? এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।
একই উপজেলার বাইগনি গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান বলেন, ঈদ আসছে, কিন্তু ঘরে কোনো আনন্দ নেই। ছেলেমেয়েদের নতুন কাপড় কিনে দিতে পারিনি। ধান বিক্রি করতে না পারায় হাতে টাকাও নেই। মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের কৃষক আবদুল করিম বলেন, সব জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। প্রতি বছর কোরবানি দিই, এবারো দেয়ার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করবেন।
মনোহরপুর গ্রামের কৃষক আলম বলেন, প্রতি বছর কোরবানি দিই, এবারো দেবো। ফসল আল্লাহর দান, তিনি নিয়ে গেছেন! কী আর করার আছে। খালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ঋণ করে বোরো ধান আবাদ করেছিলাম। সব পানি নিয়ে গেছে। যেভাবেই হোক কোরবানি তো দিতে হবে। মোহনগঞ্জ উপজেলার কৃষক পায়েল মিয়া ও রুকেল মিয়া জানান, বছরের একমাত্র বোরো ফসলের আয়ে তাদের পুরো বছর চলতে হয়। কিন্তু বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। সামান্য কিছু ধান কেটে আনলেও রোদ না থাকায় সেগুলোও নষ্ট হয়েছে।
তারা বলেন, আমাদের মতো হাজার হাজার কৃষকের একই অবস্থা। জেলায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ টন বোরো ধান, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত সরকারি সহায়তা ও কৃষি প্রণোদনা না পেলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। ঈদের আনন্দের বদলে এখন হাওরাঞ্চলের ঘরে ঘরে বিরাজ করছে হতাশা আর অনিশ্চয়তা।
