অফিসের চেয়ারে হেলান দিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন সরকারি কর্মকর্তা। টেবিলে ফাইলের স্তূপ, আর বাইরে প্ল্যান অনুমোদনের আশায় প্রহর গুনছেন ভুক্তভোগী নাগরিকরা। গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার সার্ভেয়ার মিজানুর রহমানের এমন একটি ভিডিও চিত্র সমপ্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই ভিডিওকে কেন্দ্র করে পৌরসভার ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। ?অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু অফিস সময়ে ঘুমানোই নয়, কর্তব্যে চরম অবহেলা, প্ল্যান অনুমোদনে কৃত্রিম দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি, নিজ এলাকায় চাকরির প্রভাব খাটিয়ে সিন্ডিকেট বাণিজ্য এবং প্রতিবাদ করায় গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার চেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাসময়ে জমির সার্ভে বা পরিমাপ না করার
কারণে শ্রীপুর পৌর নাগরিকদের বাড়ি তৈরির প্ল্যান অনুমোদনের ক্ষেত্রে চরম দীর্ঘসূত্রিতা পোহাতে হচ্ছে। মাসের পর মাস ঘুরেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত অনুমোদন। অথচ সার্ভেয়ার মিজানুর রহমান প্রায়শই অফিস সময়ে চেয়ারে বসে আলসেমি করে সময় কাটান কিংবা ঘুমিয়ে থাকেন, যার প্রমাণ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিজানুর রহমান গাজীপুর জেলার বাইরে অন্য একটি পৌরসভায় দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। প্রায় বছর তিনেক আগে তিনি বদলি হয়ে নিজ উপজেলা শ্রীপুর পৌরসভায় যোগদান করেন।
একই পৌরসভার বাসিন্দা হওয়ায় এবং স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি দ্রুতই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ?অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের অনুমতি ও অননুমোদিত অতিরিক্ত অর্থ (উপরি) ছাড়া কোনো ফাইল সহজে ছাড় পায় না।
সাধারণ নাগরিকরা বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন নিতে গেলে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। কেউ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে, মিজানুর রহমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্কের দোহাই দেন এবং তাদের সম্মতিতেই সবকিছু হচ্ছে বলে প্রচার করেন। পৌরসভার অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, রহস্যজনক কারণে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠিও রয়েছে সার্ভেয়ার মিজানের হাতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, তিনি সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করার কারণে কে কখন তার রুমে আসছেন বা তথ্য সংগ্রহ করছেন, তা সহজেই নজরদারি করতে পারেন।
ফলে তার অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ সহজে মুখ খোলার সাহস পায় না। ?সার্ভেয়ার মিজানের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে অতি সমপ্রতি তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবাদ করতে গেলে এক স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীর ওপর চড়াও হন তিনি। এই ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক শ্রীপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ?অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, থানায় অভিযোগ করার পর মিজানুর রহমান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং তার ভাড়াটিয়া লোকজন দিয়ে ওই গণমাধ্যমকর্মী ও তার সহকর্মীদের ওপর পুনরায় হামলার চেষ্টা চালান।
এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ?একই পৌরসভা এলাকায় বাড়ি এবং একই পৌরসভায় চাকরি করার সুবাদে মিজানুর রহমানের আধিপত্যের জাল বিস্তীর্ণ হয়ে উঠেছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ করদাতা নাগরিকদের। ?এই বিষয়ে জানতে শ্রীপুর পৌরসভার সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং ভাইরাল ভিডিও ও গণমাধ্যমকর্মীর ওপর হামলার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুতই বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, শাহিনুর আলম এ ব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের তদন্ত করা হচ্ছে এবং খুব গুরুত্বসহকারে এই অভিযোগের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ?শ্রীপুর পৌরসভার সাধারণ নাগরিকদের দাবি, অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সার্ভেয়ারের ব্যাপারে একটি সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক, যাতে শ্রীপুর পৌরসভা সিন্ডিকেট ও দুর্ভোগমুক্ত একটি আধুনিক নাগরিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
