বাংলাদেশে নতুন সরকার অর্থনীতি, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-সব ক্ষেত্রেই চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলা এবং জবাবদিহিমূলক বাস্তবভিত্তিক সংস্কারে জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। শনিবার ‘নতুন সরকারের ৩ মাস: প্রাথমিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত আলোচনায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত অবস্থান নিয়ে মতামত তুলে ধরেন বিশ্লেষক, আইন বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা ও নিরাপত্তা কৌশলবিদরা। আলোচনায় নতুন সরকারের প্রথম তিন মাসে শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বিষয় উঠে আসে।
পিপিআরসির চেয়ার ড. হোসেন জিল্লুর রহমান’র সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) ড. মোহাম্মদ মাহফুজর রহমান এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনীতিকরণ কমানোর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। বেসামরিক প্রশাসনে নিয়োগে পুরোনো ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং পুলিশের মনোবলও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। তিনি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জনতার সহিংসতাকে এখনও বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ফজলুল হক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব বর্তমান সরকারকে বড় চাপের মুখে ফেলেছে। তার মতে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া, রপ্তানি হ্রাস এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি না হওয়ায় একটি সাহসী ও সংকোচনমূলক বাজেট প্রয়োজন।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ড. মোহাম্মদ মাহফুজর রহমান বলেন, ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশকে দক্ষ হতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান বলেন, বহুপাক্ষিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে জাতীয় ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক কারণে পূর্ববর্তী সরকারের সব উদ্যোগ বাতিল করার প্রবণতা থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে আসিয়ানের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আবেগনির্ভর অবস্থান থেকে প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ ও গঠনমূলক জনআলোচনার দিকে এগিয়ে নিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘ট্যাগ’ করার সংস্কৃতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রবণতা জনজীবনকে বিষাক্ত করছে এবং সুশাসনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত সরকার সফল হলে তার সুফল দেশের সব নাগরিকই পাবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে উন্নত করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য গঠনে নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ী মহলকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।
