দুপুর পার হতেই নাটোরের লালপুর ও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চণ্ডীপুর বাজারে ভিড় বাড়তে থাকে। কারও কোলে জ্বরাক্রান্ত শিশু, কেউ আবার শ্বাসকষ্ট, হাম কিংবা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন ছোট্ট একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের সামনে। তাদের সবার আস্থার জায়গা শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহিমের ‘শিফা মেডিকেল সেন্টার’। নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া, রাজশাহীর বাঘা ও পুঠিয়া এবং পাবনার ঈশ্বরদীসহ আশপাশের পাঁচটি উপজেলার মানুষের কাছে তিনি এখন নির্ভরতার এক নাম।
গ্রামের শিশুদের নামমাত্র ফি নিয়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে তিনি গড়ে তুলেছেন এই চিকিৎসাকেন্দ্র। যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সমান আন্তরিকতা ও যত্নের সঙ্গে চিকিৎসা পাচ্ছেন। উপজেলার রহিমপুর গ্রামের টুলু খাতুন বলেন, গ্রামে এত আন্তরিক শিশু বিশেষজ্ঞ পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। এখানে ধনী-গরিব সবাই নিশ্চিন্তে চিকিৎসা করাতে পারেন। বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর থেকে আসা এক অভিভাবক বলেন, শহরে অনেক টাকা খরচ করেও যে চিকিৎসা পাওয়া যায় না, ডা. রহিম খুব কম খরচে সেই সেবা দেন। তিনি আমাদের জন্য আশীর্বাদ। শিফা মেডিকেল সেন্টারের অফিস সহকারী মো. রুহুল আমিন মানবজমিনকে জানান, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন শিশু রোগী দেখেন ডা. আব্দুর রহিম। শনি ও মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের পাঁচদিন চিকিৎসাসেবা দেন তিনি। বাকি দু’দিন তিনি রাজশাহীতে চিকিৎসা দেন। ডা. রহিম মানবজমিনকে বলেন, পড়াশোনা শেষে ২০০৪ সালে কুমিল্লায় একটি জাপানি সংস্থার অধীনে পরিচালিত শিশু হাসপাতালে দেড় বছর চাকরি করেন।
পরে ঢাকা শিশু হাসপাতালে এক বছরের প্রশিক্ষণ নেন। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা এবং গ্রামের শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে শহরের নিশ্চিত আয়েশি জীবন ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন তিনি। তার বড় ভাই মেজর জেনারেল আ: রাজ্জাক চিকিৎসাসেবার জন্য তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি সেবাকেন্দ্র নির্মাণ করে দেন। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু হয় ‘শিফা মেডিকেল সেন্টার’-এর। বর্তমানে তিনি রাজশাহীর বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। হাসপাতালের দায়িত্ব শেষে প্রতিদিন গ্রামে ফিরে অপেক্ষমাণ শিশুদের চিকিৎসা দেন তিনি। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। নিজস্ব জমিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদ্রাসা ও মসজিদ কমপ্লেক্স।
সেখানে এতিম শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। ডা. রহিম বলেন, শহর ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত খুব একটা সহজ ছিল না। তবে গ্রামের মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তাদের সঙ্গে আমার যে আত্মার সম্পর্ক টাকা দিয়ে তা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। যতদিন সুস্থ থাকবো, গ্রামের শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে যাবো, তাদের পাশেই থাকবো ইনশাআল্লাহ্।
