জনগণের জন্য বাজেট প্রণয়নের দাবি এনসিপি’র

ফন্ট সাইজ:

সরকারের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে পুরনো ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে জনগণের জন্য বাজেট প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কর ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা, কর নেয়ার ক্ষেত্রে অনলাইনে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া, একটি ফেসলেস ব্যবস্থা চালুসহ একাধিক পদক্ষপে নিয়ে আয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে দলটি। গতকাল এনসিপি ‘ছায়া বাজেট কমিটি’ আয়োজিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রথম সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। অর্থনৈতিক সংস্কার ও মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর শিরোনামে এই সেশনটি আয়েজিত হয়।

আলোচনা অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছায়া বাজেট কমিটির উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল। এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব সাদিয়া ফারজানা দিনারের সঞ্চালনায় এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী।

অনুষ্ঠানে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা এম মাসরুর রিয়াজ, সাবেক সিএজি, অর্থ সচিব এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসি’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, আইসিবি’র চেয়ারম্যান আবু আহমেদ, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব বৃটিশ কলাম্বিয়ার উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা), সিপিডি’র অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বক্তব্য দেন।
আখতার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে বাজেট মুখ্য বিষয় ছিল না। সেটি একটি কাগজে দলিল ছিল। সে সময় দেশকে পরিচালনা করতো একটি করপোরেট গোষ্ঠী। তারা দেশের পয়সাগুলোর মালিক ছিল। তাদের হাত ধরেই দেশের পয়সা বিদেশে পাচার হয়েছিল। তারা যে বাংলাদেশের নাগরিক, এখন তারা তাও শিকার করতে চায় না। এখন যখন জবাবদিহিতার সময় এসেছে, তখন তারা দেশের কাছেও জবাবদিহিতা করতে চায় না। তারা নাগরিকত্ব ছেড়ে দিতে চায়। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এবারের বাজেট যেন লুটেরাদের বাজেট না হয়। বাজেট যেন সাধারণ মানুষের জন্য হয়।
ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, আমরা আজকের বাজেট সভা করার আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের টিম আশুলিয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছে। কাওরান বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। চট্টগ্রামের খাতুন বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি।

এ ছাড়া আমরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি যে, বাংলাদেশের মানুষ সরকারের কাছে দয়া চায় না। তারা একটা ফেয়ারনেস চায়। করের বোঝা যেন কেবল নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বোঝা না হয়, শিল্পপতিরা যেন বাদ না যায়। তারা একটি নিশ্চয়তা চায়, তারা যে ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে, যেখানের প্রবাহিকা কীভাবে কাজ করবে এবং তাদের ব্যবসা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বাংলাদেশের আসন্ন বাজেটের বড় আকার নিয়ে আপত্তি না থাকলেও এর অর্থায়ন ও কাঠামোগত সংস্কারে বড় ধরনের সংকট দেখছেন সাবেক অর্থসচিব ও সোনালী ব্যাংক পিএলসি’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। সরকার যদি স্থানীয় বাজার থেকে ঋণ নেয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বেসরকারি খাতে ঋণ নেয়ার খরচ বেড়ে যাবে।

ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো খুব কঠিন। যদি সরকার বেসরকারি খাতের জন্য টাকা রাখতে চান, তাহলে বাজারে টাকা ছাপিয়ে ছাড়তে হবে। কম মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে এটা করা যেতো। কিন্তু অনেকদিন ধরে আমাদের মুদ্রাস্ফীতির অবস্থা খুব বেশি। ফলে এটা অর্থনীতিতে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।

সিপিডি’র অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯’ অনুযায়ী বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি উপস্থাপন করে। এই আইনের অধীনে অর্থমন্ত্রীর প্রতি তিন মাস পর বাজেটের অগ্রগতি কী হচ্ছে তা পেশ করবেন। এই আইনের ১২(২) ধারা অনুযায়ী যথাসম্ভব মার্চ মাসের মধ্যে সংশোধিত বাজেট পেশ করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না, যা একটি বড় আইনি ব্যত্যয়। এ ছাড়া ত্রৈমাসিক বাজেট অগ্রগতির রিপোর্ট ওয়েবসাইটে দেয়া বন্ধ হওয়াকেও তিনি স্বচ্ছতার ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে এনসিপি’র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, কর ব্যবস্থা সংস্কার করা জরুরি। গরিব মানুষ কর দেয়; অন্যদিকে যারা বড়লোক, তারা সেখান থেকে লুট করে নিয়ে যায়। কর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না করলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের সম্পর্কের ভাটা পড়বে। জনগণ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাবে। অন্তর্বর্তী সরকার যখন এনবিএআর আলাদা করতে চেয়েছিল, তখন এনবিআররের দু’টি দল আলাদা হয়ে গিয়েছে। আর এখন যারা গণতন্ত্রের কথা বলে ফেনা তুলে, তারা সে সময় এনবিআরকে বাধাগ্রস্ত করার সব চেষ্টা করেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন