বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আসন্ন নির্বাচন নিয়ে উত্তাপ চরমে। গতকাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বিসিবি’র এডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা বরদাশত করা হবে না। নির্বাচনকে শতভাগ প্রভাবমুক্ত রাখতে তিনি বদ্ধপরিকর।
গতবার অস্বচ্ছতার অভিযোগে নিজেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও, এবার পুরো প্রক্রিয়াটি তিনি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। তামিম বলেন, ‘আমি কোনো চিঠি সাইন করছি না, আমার দিক থেকে কোনো তদবির নেই। নির্বাচন যতটুকু স্বচ্ছ হতে পারে, ঠিক ততটুকুই হবে।’ তামিম আরও জানান, নির্বাচনে তার কোনো ব্যক্তিগত প্যানেল থাকবে না। বরং তিনি চান একটি উন্মুক্ত নির্বাচন। যেখানে দেশের ক্রিকেটের প্রকৃত শুভাকাক্সক্ষীরা অংশ নেবেন। তার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরাও। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই পরিবর্তন দেশের ক্রিকেটে নতুন এক যুগের সূচনা করবে। অন্যদিকে নির্বাচনে নিজের ভূমিকা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন তামিম। ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে অংশ নিচ্ছেন তিনি। জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের মনোনয়নে বিসিবির কোনো প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করেছেন। ডিসিরাই এই মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। তাই এখানে তদবিরের কোনো জায়গা নেই। তিনি তার দলের সবাইকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন যেন কোনোভাবেই অনিয়মের সাথে জড়িয়ে না পড়েন। তিনি চান সবাই নিজের যোগ্যতা দিয়ে ভোটে জয়লাভ করুক।
তামিম বলেন, ‘জেলা বা বিভাগে বিসিবির কোনো অবদান থাকে না, আমি সবাইকে স্ট্রিক্ট ইনস্ট্রাকশন দিয়েছি এসব থেকে দূরে থাকতে।’ এই প্রসঙ্গে নিজের সমর্থন ব্যক্ত করে দারুণ এক বার্তা দিয়েছেন তামিম। তিনি বলেন, ‘এমন নিরপেক্ষ অবস্থান আমাদের দেশের ক্রিকেটের সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং খেলোয়াড়দের সাহস জোগাবে।’ এই ধরনের একটি মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সঠিক মানুষগুলো দায়িত্ব পেলে ক্রিকেটের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন। নির্বাচনকে একটি উৎসবমুখর রূপ দিতে চান বোর্ড সভাপতি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্যানেল তৈরি করছেন না। বরং ৭৬টি ক্লাবকে একসঙ্গে ডেকে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সবার কাছে উন্মুক্ত ভোট চাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে চান তিনি। এতে নির্বাচনের একটি সুন্দর আবহ তৈরি হবে। তামিম বলেন, ‘আমার কোনো প্যানেল করার প্ল্যান নেই, সবাই সবার মতো ভোট চাইবে, এটিই সুন্দর।’ তামিম এই উন্মুক্ত সংস্কৃতির প্রশংসা করে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘উন্মুক্ত নির্বাচন সকল যোগ্য প্রার্থীকে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেবে, যা আমাদের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত ভালো একটি দিক।’ এতে সব ক্লাবের প্রতিনিধিরা তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন এবং যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিতে পারবেন। ভোটারদের কীভাবে কনভিন্স করবেন, সেই প্রশ্নের জবাবে বোর্ড সভাপতি জানিয়েছেন, তিনি মূলত নিজের দীর্ঘমেয়াদি ভিশন শেয়ার করবেন। তার লক্ষ্য হলো ক্রিকেটের উন্নয়ন। তামিম বলেন, ‘আমি কী করতে চাই, সেই ভিশন ভোটারদের সাথে শেয়ার করবো। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যই ক্রিকেটের আসল চালিকাশক্তি হতে পারে।’ অস্ট্রেলিয়া দলের সফর এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটাবে না। খেলা তার নিজস্ব গতিতেই চলবে এবং সবকিছু সঠিক নিয়মেই সম্পন্ন হবে।
খেলোয়াড়দের বোনাসের বদলে জিম-সুইমিংপুল
পাকিস্তানের বিপক্ষে দুর্দান্ত সিরিজ জয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিসিবি আর্থিক বোনাস দিতে চাইলেও খেলোয়াড়রা তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। এর বদলে তারা মিরপুর স্টেডিয়ামে অত্যাধুনিক জিমনেশিয়াম ও সুইমিং পুল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে তামিম ইকবাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। খেলোয়াড়দের এমন নিঃস্বার্থ চিন্তাভাবনায় বোর্ড মুগ্ধ। তামিম বলেন, ‘ওরা বলেছে ভাইয়া বোনাস আমাদের দরকার নেই, এর বদলে বেস্ট ফ্যাসিলিটিসের জিম আর সুইমিং পুল করে দিন।’ তামিম জানিয়েছেন ক্রিকেটারদের চাওয়া পূরণে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করবে না বোর্ড। বর্তমান জিমটি পুরোপুরি ভেঙে আরও বড় পরিসরে নতুন করে তৈরি করা হবে। সেখানে বিশ্বের সেরা প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। জিমের ঠিক সামনের ফাঁকা জায়গায় তৈরি হবে আধুনিক সুইমিং পুল, যেখানে থাকবে লেটেস্ট প্রযুক্তির আইস বাথ এবং হট বাথের দারুণ সুবিধা।
এর ফলে খেলোয়াড়দের ম্যানুয়ালি আর বরফ আনতে হবে তামিম বলেন, ‘মেশিনই অটোমেটিক্যালি পানি ঠাণ্ডা আর গরম করবে, আমরা সবকিছুই করে দেবো।’ তামিম বলেন, ‘এমন বিশ্বমানের একটি জিম ও সুইমিং পুল আমাদের রিকভারি প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করবে এবং ইনজুরি কমাবে।’ এই সুবিধাগুলো শুধু জাতীয় দলই নয়, বরং অনূর্ধ্ব-১৯ এবং এইচপি দলের তরুণ প্রতিভারাও নিয়মিত ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন। এ থেকে ক্রিকেট ব্যাপক সুফল পাবে বলে ধারণা। তামিম মনে করেন আর্থিক বোনাস খেলোয়াড়দের জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আনতো না। বোর্ড সভাপতির মতে, নগদ টাকার চেয়ে উন্নত কাঠামোগত সুবিধাই বেশি জরুরি। খেলোয়াড়রাও বিষয়টি অনুধাবন করে এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মূলত হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) দলকে ঘিরেই বোর্ডের এখন সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
তামিম বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট এইচপিকে নিয়েই হবে, কারণ এইচপিকে পুরোপুরিভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।’ তামিম বলেন, ‘এইচপি দলের জন্য এমন বিশ্বমানের সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে, আমরা ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় পাবো।’
