চাহিদার শীর্ষে নেত্রকোণার হাওরের গরু

চাহিদার শীর্ষে নেত্রকোণার হাওরের গরু

ফন্ট সাইজ:

মাঠ জুড়ে দল বেঁধে চড়ছে হাজার হাজার গরু, মহিষ আর ছাগল। কোনো কৃত্রিম ফিড নয়, নেই মোটাতাজাকরণে ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহারও। বছরের পর বছর ধরে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠে এসব গবাদিপশু। আর এ কারণেই কোরবানির ঈদ সামনে এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতা ও পাইকারদের কাছে বাড়তে থাকে নেত্রকোণার হাওরের গরুর চাহিদা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় পশুর হাটে ‘হাওরের গরু’ নামেই আলাদা পরিচিতি রয়েছে এসব পশুর।

খামারিরা বলছেন- প্রাকৃতিক ঘাস, খোলা পরিবেশ ও দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালনের কারণে এখানকার গরুর মাংসের স্বাদ আলাদা হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি থাকে। কিন্তু এবার কোরবানির ঈদের আগে হাওরের খামারিদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে আগাম বন্যা ও অসময়ে হাওরে পানি প্রবেশ। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র গোখাদ্য সংকট। অনেক খামারি বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রি করছেন। নেত্রকোণার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি, কেন্দুয়া, আটপাড়া ও বারহাট্টা উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই গরু পালনের ঐতিহ্য রয়েছে। কেউ পারিবারিকভাবে দুই-তিনটি গরু পালন করেন, আবার অনেকে গড়ে তুলেছেন ছোট-বড় খামার। অধিকাংশ খামারি বছরের শুরু থেকেই কোরবানির বাজারকে সামনে রেখে গরু লালন-পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। হাওরাঞ্চলের খামারি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আগে হাওরের মাঠে গরু চড়িয়ে খুব সহজে পালন করা যেতো। এখন হঠাৎ পানি চলে আসায় ঘাস নেই। বাজার থেকে খড় আর খাবার কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

খালিয়াজুড়ির আরেক খামারি সোহেল মিয়া বলেন, একটা গরু বড় করতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু এখন গরুর খাবারের জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে। যে দামে বিক্রি হওয়ার কথা, সেই দামও পাচ্ছি না। মদন উপজেলার খামারি রহিম উদ্দিন বলেন, হাওরের গরুর আলাদা সুনাম রয়েছে। কিন্তু এবার পানি আসায় আমরা বিপদে পড়েছি। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাওরের গরু প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠায় এসব গরুর চাহিদা প্রতি বছরই বেশি থাকে। এ কারণে কোরবানির মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা হাওরে এসে গরু কিনে নিয়ে যান। মোহনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, হাওরের গরুর চাহিদা সবসময়ই বেশি। তাই আমরা প্রতি বছর এখান থেকে গরু কিনে বিভিন্ন জেলায় পাঠাই। মোহনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, হাওরের গরুর চাহিদা সবসময়ই বেশি। আমরা প্রতি বছর এখান থেকে গরু কিনে বিভিন্ন জেলায় পাঠাই। তবে খামারিদের আরেকটি বড় উদ্বেগ ভারতীয় গরু। তাদের দাবি, সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে ভারতীয় গরু ঢুকলে দেশীয় গরুর বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আটপাড়ার খামারি নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা দেশীয়ভাবে গরু পালন করি। কিন্তু যদি ভারতীয় গরু বাজারে ঢুকে পড়ে, তাহলে দাম কমে যায়। সরকার যদি সীমান্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে খামারিরা ভালো দাম পাবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে নেত্রকোণায় মোট ১১ হাজার ৬৯৩ জন খামারি গবাদিপশু প্রস্তুত করেছেন। এর মধ্যে গরু রয়েছে ৮৪ হাজার ৫৭৮টি। সবমিলিয়ে জেলায় মোট কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৮টি। জেলায় এবার কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৬৭টি পশু। সে হিসেবে চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত থাকবে ১৯ হাজার ১২১টি গবাদিপশু। অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিকুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার বন্ধে মনিটরিং করা হচ্ছে। আশা করছি, স্থানীয় খামারিরা এবারো ভালো বাজার পাবেন।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন