পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ

পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ

ফন্ট সাইজ:

২০০৩-এর কথা, অস্ট্রেলিয়ার ছুড়ে দেয়া ৪১৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই মহাকাব্যিক জয়ের পর আর কেউ এই রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। শুধু কি তাই, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে মাত্র চারবার ৪০০ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড আছে। তাই প্রশ্ন ছিল তাহলে কি নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে পাকিস্তান! সিলেট টেস্টের পঞ্চম দিনের সকাল অন্তত সেই ভয়টাই দেখাচ্ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। তবে না, শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বাংলাদেশ দল পাকিস্তানকে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করেছে। ভয়কে জয় করে বাংলাদেশ তুলে নিয়েছে দুর্দান্ত জয়। এই জয় যেন এক মহাকাব্য, যার প্রতিটি লাইনে লেখা আছে টাইগারদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। মোহাম্মাদ রিজওয়ান ও সাজিদ খানের জুটিতে যখন শঙ্কা জাগছিল, তখনো টাইগারদের চোখে ছিল জয়ের স্বপ্ন। ম্যাচ শেষে সেই স্বপ্নের কথাই জানালেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘ওই এক ঘণ্টার আবেগ ব্যাখ্যা করা মুশকিল। সত্যি বলতে, ওরা ভালো ব্যাটিং করছিল। আসলে আমরা একটু চাপেও ছিলাম। তবে আগের টেস্ট ম্যাচগুলো থেকে আস্তে আস্তে এখন ওই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, প্যানিক না করা শিখেছি, এসব আরও ভালো হয়েছে।’

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম ঘণ্টার সেই মারাত্মক চাপ দারুণভাবে সামলে বাংলাদেশ ফেরে স্বরূপে। পানি পানের বিরতির পর তাইজুল ইসলামের স্পিন ঘূর্ণিতেই যেন জাদুকরী এক পরিবর্তন আসে। এরপর আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়নি সফরকারী দল। ৭৮ রানে দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নেয় টাইগাররা। টানা দুই টেস্টে এমন দাপুটে জয়ে দলের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ১০ দিনের এই কঠিন লড়াইয়ে দলের প্রতিটি সদস্যের অবদান অনস্বীকার্য। মিরপুরের পর সিলেটেও শেষ দিনের রোমাঞ্চকর জয় এসেছে। টেস্ট ইতিহাসে এটি বাংলাদেশের নবম এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় সিরিজ জয়। তবে সবচেয়ে বড় চমক হলো, এ নিয়ে মোট পাঁচবার প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়লো টাইগাররা। এর আগে ২০০৯ ও ২০১৮তে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এবং ২০১৪তে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল টাইগাররা।

এরপর ২০২৪-এ পাকিস্তানে গিয়ে স্বাগতিকদের ধবলধোলাই করার পর, এবার দেশের মাটিতেও একই ব্যবধানে তাদের হোয়াইটওয়াশ করলো টাইগাররা। এই জয় শুধু সংখ্যার নয়, এটি চরম মানসিক দৃঢ়তারও প্রতীক। দলের প্রতিটি খেলোয়াড়, এমনকি যারা মাঠে নামার সুযোগ পায়নি, তাদেরও অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল। কোচিং স্টাফদের অবদানও কম নয়। অধিনায়ক শান্তর কণ্ঠেও তাই পরম গর্বের সুর। তিনি বলেন, ‘১০ দিন ধরে টেস্ট সিরিজ খেলতে পেরেছি। এটা অবশ্যই গর্বের ব্যাপার। সাধারণত আমরা ওভাবে পাঁচদিন, পাঁচদিন করে ক্রিকেট খুব একটা খেলিনি অতীতে। এটাও উন্নতির জায়গা। পুরো সিরিজে দল হিসেবে খেলতে পেরেছি।’

এই সিরিজের আরেকটি বড় প্রাপ্তি হলো অকুণ্ঠ দর্শক সমর্থন। গতকাল বৃষ্টির প্রবল শঙ্কা মাথায় নিয়েও যারা গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন, তাদের সমর্থন টাইগারদের জুগিয়েছে বাড়তি অনুপ্রেরণা। বিশেষ করে যখন দীর্ঘ সময় ধরে কোনো উইকেট পড়ছিল না, তখনো গ্যালারি থেকে আসা অবিরাম উৎসাহ দলের মনোবল দারুণভাবে চাঙ্গা করেছে। শান্তর মতে, দর্শকরা এখন টেস্ট ক্রিকেটের আসল মোমেন্টাম খুব সহজেই বুঝতে পারেন এবং ঠিক সেই অনুযায়ী দলকে সাপোর্ট দেন। এই নিঃস্বার্থ সমর্থন খেলোয়াড়দের জন্য এক বিরাট পাওয়া। দেশের মাটিতে এমন দাপুটে জয়, তাও আবার শক্তিশালী পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে, এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

এর আগে পাকিস্তানে গিয়ে তাদের হারানোর পর, এবার দেশের মাটিতেও ঠিক একই ব্যবধানে জয় এসেছে। ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এটিকে অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবেই দেখছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি মানুষের এই গভীর ভালোবাসা দেখে খেলোয়াড়রাও দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। ভবিষ্যতে এই দর্শক সমর্থন দলকে আরও ভালো খেলতে এবং নতুন ইতিহাস গড়তে বিশাল শক্তি জোগাবে। মাঠে দর্শকদের এই অসাধারণ সম্পৃক্ততা নিয়ে শান্ত বলেন, ‘গ্যালারিতে যে কয়েকজন দর্শকই ছিলেন, তারা যেভাবে সাপোর্ট করেছেন, অবশ্যই তাদেরকে ধন্যবাদ। আজকে একটা সময় দেখছিলাম যে, যখন উইকেট পড়ছিল না, গ্যালারি থেকে সাপোর্টটা আমরা পাচ্ছিলাম। একটা নতুন ব্যাপার যে, টেস্ট ক্রিকেটে দর্শকরা কম-বেশি যা আসছে, তারা খেলার মোমেন্টামটা বুঝতে পেরে আমাদেরকে ওই সাপোর্টটা দিয়েছেন।’

তবে এমন অভাবনীয় জয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে একেবারেই রাজি নয় বাংলাদেশ দল। শান্তর মতে, দলের আরও অনেক উন্নতি করার জায়গা এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজ খেলার আগে দলের দুর্বলতাগুলো খুব দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। টপ অর্ডারের ব্যাটিং এবং নতুন বলে বোলিংয়ে পেসারদের আরও অনেক বেশি ধারালো হতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তবে পেসার ও স্পিনারদের মধ্যে এখন যে এক দারুণ সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা দলের ভবিষ্যতের জন্য খুবই ইতিবাচক একটি দিক। এই চমৎকার ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে দেশের জন্য আরও বড় বড় সাফল্য আসবে বলেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন শান্ত। তিনি গভীরভাবে মনে করেন, দলের বোলারদের হাতে এখন যথেষ্ট অপশন আছে, যা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জেতাতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।

ঐতিহ্যগত স্পিন নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে পেসারদের এই আগ্রাসী উত্থান বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। এখন পেসাররা নিয়মিত উইকেট নিচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে সব সময় দারুণ চাপে রাখছে, যা আগে খুব একটা দেখা যেতো না। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং দলের ধারাবাহিক উন্নতির লক্ষ্যের কথা জানিয়ে শান্ত বলেন, ‘যেটা সবসময় বলি, আমাদের টেস্ট টিমকে আস্তে আস্তে গড়ে তুলতে হবে। আরও অনেক জায়গা আছে উন্নতির। ওই জায়গাগুলো ঠিকঠাক করতে হবে। ওসব ঠিকঠাক করে যখন আমরা দেশে এবং দেশের বাইরে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলবো, তখন বলবো যে, আমাদের দলটা আগের থেকে ভালো অবস্থানে যাচ্ছে।’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন