সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একইসময় নতুন করে ১ হাজার ৩৩৭ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টায় দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত অবস্থায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৯ শিশুর মধ্যে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে রয়েছে ৩ জন করে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছে। জেলা হিসেবে ঢাকা ও মৌলভীবাজারে সবচেয়ে বেশি দু’জন করে মারা গেছে। একইসময় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৬৪ জন। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১১৫ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১১০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ৭৩ জনের। বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি ৫৪৪ জন সন্দেহজনক হাম রোগী ঢাকা বিভাগে শনাক্ত হয়েছে। তারপর চট্টগ্রামে ২৩০ ও বরিশালে ১৪৭ জন শনাক্ত হয়েছে। আর নিশ্চিত হাম শনাক্তের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে, ৫৪ জন।
ঈদের ছুটিতে জরুরি বিভাগ, হাম ওয়ার্ড চালু রাখতে হবে সার্বক্ষণিক:
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখতে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নির্দেশনায় জরুরি বিভাগ, লেবার রুম, আইসিইউ, ল্যাব, হাম ওয়ার্ড এম্বুলেন্সসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা সার্বক্ষণিক চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হাম রোগীদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঈদের ছুটিকালীন ২৫শে মে থেকে ৩১শে মে পর্যন্ত হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জরুরি বিভাগে প্রয়োজনে অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি লেবার রুম, ইমারজেন্সি অপারেশন থিয়েটার, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও জরুরি ল্যাবসেবা চালু রাখতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অন-কল সেবাও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। হাম পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শিশু ওয়ার্ড এবং হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত জনবল রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সকাল ও বিকাল দুই দফা রাউন্ড দিতে বলা হয়েছে। ঈদের আগে পর্যাপ্ত ওষুধ, আইভি ফ্লুইড, কেমিক্যাল রি-এজেন্ট ও সার্জিক্যাল সামগ্রী মজুত রাখার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টোরকিপার বা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিজ নিজ জেলা ও উপজেলায় অবস্থান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ঈদের সময় কোনো অবস্থাতেই এম্বুলেন্স সেবা বন্ধ রাখা যাবে না। রোগী রেফারের আগে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় রেফার কমানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, পশুর হাটসংলগ্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আগাম চিঠি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ছুটির সময়ে হাসপাতালগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ সতর্কতা জোরদার রাখার নির্দেশও রয়েছে। হাসপাতাল প্রধানদের ঈদের দিন রোগীদের উন্নতমানের খাবার পরিবেশন তদারকি এবং রোগীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথাও বলা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহির্বিভাগ টানা ৭২ ঘণ্টার বেশি বন্ধ রাখা যাবে না। প্রয়োজন হলে ২৬শে মে ও ৩০শে মে হাসপাতাল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা নিতে পারবেন। এ ছাড়া বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোকে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের অধীনে সার্বক্ষণিক জরুরি বিভাগ, প্রসূতি বিভাগ ও হাম ওয়ার্ড চালু রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের ছুটিকালে যেকোনো দুর্যোগ বা অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে জানাতে হবে।
হাম নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ৬টি বিশেষ নির্দেশনা: সাম্প্রতিককালে বেসরকারি হাসপাতালে হাম ও হাম সন্দেহজনক রোগী ভর্তি না করার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা) ৬টি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনাটি স্বাক্ষর করেছেন পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সকল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে আবশ্যিকভাবে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা কেবিন নির্ধারণ করতে হবে এবং ভর্তির আগেই চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। প্রতিটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শয্যা দরিদ্র জনগণের জন্য বিনামূল্যে সংরক্ষিত থাকার বিধান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক অর্থাৎ ৫ শতাংশ শয্যা হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য নির্ধারিত রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে কমপক্ষে ১২টি শয্যা এই উদ্দেশ্যে বরাদ্দ থাকতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিটি ভর্তি রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ একজন অভিভাবক বা দর্শনার্থী থাকতে পারবেন। ভর্তি রোগীর তথ্য প্রতিদিন ইএমএআইএস সার্ভারে (surveillance.dghs.gov.bd) আপলোড করতে হবে। প্রয়োজনে হটলাইন নম্বর ০১৭৫৯১১৪৪৮৮-তে যোগাযোগ করা যাবে। পাশাপাশি হাম রোগীদের চিকিৎসায় স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করতে বলা হয়েছে। এক নজরে ৬টি মূল নির্দেশনা-১. সব বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড/কেবিন নির্ধারণ করবে। ২. ভর্তির আগেই চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. ১০% বিনামূল্যের শয্যার অর্ধেক (৫%) হাম রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে; যেমন- ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ন্যূনতম ১২টি শয্যা। ৪. প্রতিটি ভর্তি রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ ১ জন অভিভাবক/দর্শনার্থী থাকতে পারবেন। ৫. ভর্তি রোগীর তথ্য প্রতিদিন ইএমএআইএস সার্ভারে আপলোড করতে হবে; ৬. হাম রোগীদের চিকিৎসায় স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করতে হবে।
