প্রযুক্তিনির্ভর-নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠাই সরকারের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

প্রযুক্তিনির্ভর-নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠাই সরকারের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

দেশে প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবন মিলনায়তনে তিনদিনব্যাপী ভূমিসেবা মেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থেকে শুরু করে এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুনা নয় বরং জনগণের সেবা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি। আমাদের লক্ষ্য একটি দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

সারা দেশে ভূমিসেবা মেলা-২০২৬ এর উদ্বোধন করে তিনি বলেন, সারা দেশের সকল জেলা উপজেলায় আজ থেকে শুরু হওয়া ভূমি মেলার মাধ্যমে জনগণ নিঃসন্দেহে উপকৃত হবেন। কারণ মেলায় ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান গ্রহণ এবং ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির সুবিধা থাকছে। অনুষ্ঠানে আপনাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমি আনন্দিত ও গর্বিত। একটি ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। আমি এই ভূমি মেলার সাফল্য কামনা করছি।

ভূমির দক্ষ ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণও কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং জটিলতাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বর্তমান সময়ের অপরিহার্য দাবি।

তিনি আরও বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। একইসঙ্গে ভূমি প্রশাসনের প্রায় সকল সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে নিয়ে এসে নাগরিকদের জন্য সেবা গ্রহণকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না।

নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করে জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে সহায়তার লক্ষ্যে সারা দেশে ভূমিসেবা মেলা আয়োজন এবং জমি ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ এবং আধুনিকায়ন করার ব্যাপারে আমরা জাতীয় নির্বাচনের কয়েক বছর আগে প্রণীত ৩১ দফা এবং সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারেও উল্লেখ করেছিলাম। আজ থেকে সারা দেশে তিনদিনব্যাপী এ ধরনের ভূমিসেবা মেলার আয়োজনের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে দেয়া আরও একটি নির্বাচনী ইশতেহার পূরণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এভাবেই সরকার পর্যায়ক্রমে একের পর নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়েই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বেশি জমিজমা সংক্রান্ত উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতগুলোতে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সবমিলিয়ে ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাই বেশি। সুতরাং এই মুহূর্তে সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি। তবে প্রচলিত আদালতের বাইরেও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত কিংবা অল্টারনেটিভ ডিসপুট রিসোলিউশন-এডিআর অর্থাৎ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো আইনানুগ মাধ্যম অবলম্বনের দিকে আরও জোর দেয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। এতে একদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে যেমন অল্প সময় লাগবে অপরদিকে অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধ হয়তো শত্রুতায় রূপ নেবে না।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় ইতিমধ্যেই দেশের ৬১টি জেলায় বর্তমানে ৮৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত সেবামূল্যের বিনিময়ে নাগরিকগণ সহজেই ভূমিসেবার আবেদন করতে পারছেন এবং সরকারি ফি পরিশোধ করতে সক্ষম হচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের আরও ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি নাগরিকদের হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা পৌঁছে দিতে চালু করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপ ‘ভূমি’।
ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিক হলে বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি, ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা যায় জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত বেশি সহজ হয়ে যায়। জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিত করায় আমি আশা করি জমিজমা সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হবে। একইসঙ্গে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্মও কমবে। চলমান এই ভূমিমেলা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণের নিজেদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করবে।

ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এবং সচিব এএসএম সালেহ উদ্দিন বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সমাজ কল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, আইন ও বিচার মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন