হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা তথা শিশুদের বাঁচানোর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সে বিষয়ে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ ও ব্যারিস্টার মো. হুমায়ুন কবির পল্লব। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিলা মমতাজ।
এর আগে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৩৫২ শিশুর প্রত্যেক পরিবারকে ২ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিটের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে আদেশের জন্য গতকাল দিন ঠিক করেন হাইকোর্ট। তারই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে রুল জারি করেছেন। রুলে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রতিনিধি সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কেন গঠন করা হবে না এবং হামের প্রাদুর্ভাবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রত্যেকের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও আইইডিসিআরের পরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। গত ১০ই মে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন।
শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চে দু’টি রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে এই হাম সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত চেয়ে, তদন্ত কমিটি চেয়ে এবং হাম প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটা ১০ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন চেয়ে দু’টি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম একটি রিপিটিশন দায়ের করে বলেছেন কেন কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট অনুযায়ী একটি কমিশন গঠন করা হবে না এই মর্মে রুল চেয়েছেন। দ্বিতীয় মামলাটি হচ্ছে ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট অনেকগুলো প্রেয়ার চেয়েছেন। হামের কারণে টিকার অভাবে যে ৩৪৩ জন শিশু মৃত্যুবরণ করেছে বলে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাদের পরিবারকে কেন পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে না। তারা ক্ষতিপূরণ চেয়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের কথা লিখেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে আদালত বলেছেন যে, কেন পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না। যদি কারও অবহেলা কিংবা কোনো অকার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ ব্যপারে আমি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সে সম্পর্কে আমি জানার চেষ্টা করেছি। স্বাস্থ্য সচিব জানিয়েছেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্রই তিনি এই হামের টিকা সংগ্রহ করার জন্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন। সচিব সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী যে একটা টেকনিক্যাল কমিটি আছে এবং সেই টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শ এবং তারা তথ্য পেয়েছিল যে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাবটা একটু বেশি। তাৎক্ষণিকভাবে এই জেলাগুলো এবং উপজেলাগুলোকে আইডেন্টিফাই করে প্রচলিত পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি গ্যবি ইউরোপ ভিত্তিক তাদের মাধ্যমে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ইউনিসেফের সহায়তায় হামের টিকা সংগ্রহ করেছেন। ৫ই এপ্রিল ১৮টি জেলার অন্তর্গত এবং জেলা সদরসহ ৩০টি উপজেলায় হামের প্রথম ডোজ তারা দিয়েছেন। পরবর্তীতে ১২ তারিখে ঢাকার দু’টি সিটি করপোরেশন উত্তর এবং দক্ষিণ, বরিশাল এবং ময়মনসিংহেও দ্বিতীয়বার হামের টিকা প্রদান করা হয়েছে। সরকারের সর্বশেষ যে তথ্য অনুযায়ী এই হামের টিকাগুলো দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যে ডেভেলপমেন্ট হয়েছে শিশুদের মধ্যে তার পরিমাণ প্রায় ৯৫ শতাংশের উপরে।
তিনি বলেন, হামের টিকার উপসর্গ থাকে মাত্র ৪ দিন। কিন্তু হামের উপসর্গ থেকে অন্য ভেরিয়েশন নানা রকম নিউমোনিয়ায় শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছেন। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরকারের পক্ষ থেকে যেমন টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশ মোতাবেক তারা কাজ করছেন। এর বাইরেও শিশুদের বিষয়ে ১০ জন বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞকে নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবসহ তাদের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন। সচিব সাহেব আরও জানিয়েছেন যে, ইউনিসেফ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন গ্যবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে শুধুমাত্র দেশীয় টেকনিক্যাল কমিটি না আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মোতাবেক সরকার হামের প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনা, নির্মূল করা এবং ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয় সে ব্যাপারে সরকার প্রয়োজনে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
