ভারতীয় সীমান্তবর্তী প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত চায়ের রাজধানীখ্যাত মৌলভীবাজার জেলার গবাদি পশুর খামারিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রতি বছরই ঈদুল আজহার আগে কোরবানির জন্য প্রস্তুত গবাদি পশুগুলোর যত্নে এমন ব্যস্ততা বাড়ে খামারিদের। বছর জুড়ে এ সময়ের অপেক্ষায় থাকেন খামারিরা। কারণ তাদের সারা বছরের আয়-ব্যয় ও লাভ-ক্ষতির হিসাবটা শুরু ও শেষ এই সময়েই। এ বছর ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু নিয়ে প্রস্তুত মৌলভীবাজারের ছোট-বড় প্রায় ৬ হাজার ২২৫টি খামার। খামারিরা জানান, প্রতি বছরই কোরবানির সময় ভারতীয় গবাদি পশুর দখলে চলে যায় কোরবানির হাট।
এতে করে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক পর্যায়ের (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) উদ্যোক্তা গবাদি পশু খামারিরা। খামারিদের দাবি, তাদের টিকিয়ে রাখতে হলে ঈদের এই মৌসুমে ভারতীয় বা অন্য কোনো দেশের গবাদি পশু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে যেন না ঢুুকে। তারা জানান, সীমান্তের ওপার থেকে চোরাই পথে গবাদি পশু আসার কারণে তাদের খামারে পালিত অনেক গরু ও মহিষ অবিক্রিত থেকে যায়। যা বিক্রি করতে পরবর্তী বছরের কোরবানির ঈদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তা ছাড়া, ভিনদেশি গবাদি পশু এই সময় বাজারে সয়লাভ হওয়াতে সারা বছর খাদ্য, ওষুধ, শ্রমিকসহ নানা ব্যয়ের পর ন্যায্যমূল্যে খামারিরা তাদের গবাদি পশুগুলো বিক্রি করতে পারেন না। ঈদকে সামনে রেখে জেলা জুড়ে ভালো দামের আশায় ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এখন খামারিরা তাদের খামারে গবাদি পশুগুলো নিবিড়ভাবে পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। জানা যায়, এ বছর জেলার মোট চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে ২ হাজার ৮১২টি পশু।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, বাজারে সুস্থ পশু বিক্রির জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রচারণার পাশাপাশি মেডিকেল টিম গঠন করেছে। আসছে ঈদুল আজহায় জেলায় কোরবানির পশুর মোট চাহিদা রয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি। স্থানীয় খামারিদের কাছে ৭৪ হাজার ৫৮৪টি কোরবানির পশু মজুত রয়েছে। সে হিসেবে উদ্বৃত্ত রয়েছে ২ হাজার ৮১২টি পশু। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে ঘিরে প্রস্তুত মৌলভীবাজারের পশুর খামারগুলো। খামারে ১৬০ কেজি থেকে প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের কোরবানির পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পশুর আকারভেদে খামারিরা মূল্য ওজনে প্রতি কেজি ৪৮০ থেকে ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। খামারের পরিচর্যাকারীরা জানান, বাজারে গো-খাদ্যের এখন চড়া দাম। তারা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করছেন।
খাওয়ানো হচ্ছে ধানের কুড়া, খৈল, গমের ভুসি ও সবুজ ঘাস। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নাঈম অ্যান্ড ইসমাইল ডেইরী ফার্মের স্বত্বাধিকারী সরোয়ার আহমদ টিপু ও মল্লিকপুর এগ্রো ফার্মের সুপার ভাইজার বিষ্ণু রঞ্জন দাস ভানু জানান, সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার পরিচালনায় আগের চেয়ে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়াতে খামারিরা বেকায়দায় পড়েছেন। তারা জানান, সারা বছর গবাদি পশু লালন-পালন শেষে কোরবানির হাটে বিক্রির অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু ওই সময়টাতে ভারত থেকে চোরাই পথে আসা গবাদি পশুর কারণে তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হন। তাদের জোর দাবি, অবৈধ পথে বিদেশি গবাদি পশু যাতে দেশে না আসে- এ বিষয়ে সরকার দৃঢ় উদ্যোগী হন। স্থানীয় খামারিরা মনে করেন, সরকারিভাবে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রান্তিক পর্যায়ে আরও বড় পরিসরে খামার গড়ে উঠবে। যা দেশের মাংসের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুল আলম খান জানান, খামারে গো-খাদ্যের খরচ কমাতে স্থানীয়ভাবে ঘাস চাষের পরামর্শ ও চোরাই পথে যাতে পশু প্রবেশ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানান।
