ম্যাচের চাকা ঘুরলো পেন্ডুলামের মতো। কখনো মনে হলো সাদা পোশাকে সিলেটে প্রথমবার পাকিস্তানকে হারানোর উৎসবে মাতবে বাংলাদেশ, আবার কখনো মনে হলো ৪৩৭ রানের পাহাড় ডিঙিয়ে রূপকথা লিখবে পাকিস্তান। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো ম্যাচের চতুর্থ দিন বাড়ালো রোমাঞ্চ। ম্যাচ জিততে শেষ দিনে বাংলাদেশের প্রয়োজন ৩ উইকেট, আর পাকিস্তানের চাই ১২১ রান। চতুর্থ দিন শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ৭ উইকেটে ৩১৬ রান। এক প্রান্ত আগলে রেখে ৭৫ রানে অপরাজিত মোহাম্মদ রিজওয়ান। তবে দিন শেষে বাংলাদেশ যে নির্ভার হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরতে পেরেছে, তার কৃতিত্ব বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলামের। শেষ বিকেলে তার করা জাদুকরী ২ ওভারই টাইগারদের ম্যাচে ফিরিয়েছে।
দিনের শুরু থেকে গতি আর বাউন্সে পাকিস্তান শিবিরে কাঁপন ধরান তাসকিন আহমেদ ও শরীফুল ইসলাম। তবে দিনের প্রথম সাফল্য এনে দেন নাহিদ রানা। ইনিংসের ১১তম ওভারে রানার এক এক্সট্রা বাউন্স নেওয়া গতিশীল ডেলিভারি আব্দুল্লাহ ফজলের (৬) ব্যাটের কানায় লেগে গালিতে যায়, যেখানে বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত এক ক্যাচ নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। সফরকারীদের রান তোলার চাকা সচল রাখেন আরেক ওপেনার আজান আওয়াইস। তবে মিরাজের অফস্পিনের লাইন মিস করে ২১ রানে এলবিডাব্লিউর শিকার হন তিনি। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি এই ওপেনার।
৪১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান যখন কাঁপছিল, তখন প্রথম সেশনের বাকি সময়টা ঠাণ্ডা মাথায় পার করে দেন অধিনায়ক শান মাসুদ ও বাবর আজম। মধ্যাহ্নভোজের বিরতি থেকে ফিরেই খোলস ছেড়ে বের হন বাবর ও মাসুদ। বাংলাদেশি স্পিনারদের ওপর চড়াও হয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার। তৃতীয় উইকেটে ৯২ রানের জুটি গড়ে ম্যাচটি যখন তারা পাকিস্তানের দিকে হেলে দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে তাইজুলের আবির্ভাব। ৩৫তম ওভারের শেষ বলে লেগ স্টাম্পের বাইরের এক আলগা বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে উইকেটকিপার লিটন দাসের গ্লাভসে ক্যাচ দেন বাবর (৪৭)। সাজঘরে ফেরার সময় বাবরের শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছিল, কতটা দৃষ্টিকটুভাবে নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন তিনি। বাবরের আউটের ধাক্কা সামলানোর আগেই সৌদ শাকিলকে (৬) সাজঘরের পথ দেখান নাহিদ রানা। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে লিটনের দ্বিতীয় শিকার হন শাকিল।
অন্যপ্রান্তে ক্যারিয়ারের ১৪তম ফিফটি তুলে নেয়া শান মাসুদকেও (৭১) বেশিক্ষণ টিকতে দেননি তাইজুল। তাইজুলের বলে সুইপ করতে গিয়ে শর্ট লেগে মাহমুদুল হাসান জয়ের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হন পাকিস্তান অধিনায়ক। ১৫৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে পাকিস্তান। চা-বিরতির পর ম্যাচের সবচেয়ে কঠিন ও নাটকীয় পর্বের শুরু হয়। ষষ্ঠ উইকেটে জুটি বাঁধেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আগ। বাংলাদেশি বোলারদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে এই দুজনে স্কোরবোর্ডে যোগ করেন ১৩৪ রান। এই জুটির ওপর ভর করে পাকিস্তান ম্যাচ জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ৭৩তম ওভারে রানআউটের চেষ্টা করেন মুশফিক।
তার সরাসরি থ্রো যখন স্টাম্প ভাঙে, সালমান তখন ক্রিজ থেকে মাত্র এক সেকেন্ডের দূরত্বে। থার্ড আম্পায়ারের নট-আউটের সিদ্ধান্ত দেন। রিজওয়ান ফিফটি পেরিয়ে এগোচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে, সালমানও ৭১ রান করে জয়ের সুবাস পাচ্ছিলেন। ৮০ ওভার শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে নতুন বল নেয়ার সুযোগ ছিল। আম্পায়ার নতুন বল নিয়ে আসলেও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত পুরোনো বলেই বোলিং চালিয়ে যাওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। আর এই মাস্টারস্ট্রোকই বদলে দেয় ম্যাচের ভাগ্য। ৮২তম ওভারে পুরোনো বলের রিভার্স সুইং ও টার্ন কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে সালমান আগাকে (৭১) বোল্ড করে দেন তাইজুল।
ভেঙে যায় ১৩৪ রানের বিপজ্জনক জুটি। স্টেডিয়াম জুড়ে তখন হাজারো দর্শকের গর্জন। সেই উল্লাসের রেশ কাটতে না কাটতেই নিজের পরের ওভারে এসে হাসান আলীকে শূন্য রানে বোল্ড করেন তাইজুল। ৫ উইকেটে ২৯৬ রান থেকে মুহূর্তের মধ্যে পাকিস্তানের স্কোর হয়ে যায় ৭ উইকেটে ৩০৮! তবে পাকিস্তানের একমাত্র আশা হয়ে ক্রিজে টিকে আছেন ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান। তার সঙ্গে ৮ রানে অপরাজিত আছেন সাজিদ খান।
