পাকিস্তানের বিপক্ষে সিলেট টেস্ট যেন ঢাকা পড়েছে মুশফিকুর রহীমের ছাঁয়াতে। আরও একবার নিজের ব্যাটের জাদুতে দলকে জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। মেঘলা আকাশ ও পেস সহায়ক কন্ডিশনে দলের চরম বিপর্যয়ে ‘ত্রাতা’ হয়ে আবির্ভূত হন মুশফিক। প্রথম সেশনেই দ্রুত অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বিদায় নিলে চরম চাপে পড়ে স্বাগতিক দল। ঠিক তখনই সতীর্থ লিটন দাসকে সঙ্গে নিয়ে অনবদ্য এক জুটিতে পাল্টা প্রতিরোধ গড়েন অভিজ্ঞ এই যোদ্ধা।
উইকেটের চারপাশে দৃষ্টিনন্দন সব শট খেলে প্রতিপক্ষের পাকিস্তানি বোলারদের রীতিমতো শাসন করেছেন তিনি। পেসার মোহাম্মদ আব্বাসের বলে স্কয়ার কাট থেকে বাউন্ডারি আদায় করে বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন দুর্দান্ত এই ব্যাটার। সেঞ্চুরির আনন্দে নিজের হেলমেট খুলে শূন্যে ব্যাট ছুড়ে মারেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে মাথা নত করে জানান পরম কৃতজ্ঞতা। তার চরম ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ে ভর করে অতিথিদের সামনে জয়ের জন্য ৪৩৭ রানের পাহাড়সম বিশাল লক্ষ্য ছুড়ে দিয়েছে স্বাগতিকরা।
খুররাম শাহজাদ ও সাজিদ খানদের বিষাক্ত স্পেলগুলো দারুণ দক্ষতায় সামলেছেন তিনি। দিনশেষে তার এই মহাকাব্যিক ইনিংসটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলতি লীগে দেশের অন্যতম সেরা এক লড়াইয়ের নিখুঁত গল্প হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকব।
এই অনবদ্য ইনিংসে একটি দারুণ ব্যক্তিগত মাইলফলক ছুঁয়েছেন মুশফিক। সতীর্থ মুমিনুল হককে টপকে টেস্টে এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির একমাত্র মালিক তিনি। এটি ছিল সাদা পোশাকে তার ১৪তম শতরান। আগের ১৩টি সেঞ্চুরি নিয়ে মুমিনুলের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন অভিজ্ঞ এই তারকা। ১৭৮ বলে কাঙ্ক্িষত তিন অঙ্কের জাদুকরী ফিগার স্পর্শ করেন তিনি।
এই সেঞ্চুরিটি এসেছে চরম ধৈর্য আর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের সংমিশ্রণে। ক্রিজে এসে শুরুতে খানিকটা সময় নিয়েছিলেন তিনি। থিতু হয়ে সাবলীল গতিতে রান তুলতে থাকেন। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান লিটন দাস। এই দুজনের ব্যাটে ভর করে শক্ত ভিত পায় দল। পঞ্চম উইকেটে ১২৩ রানের অনবদ্য জুটি গড়েন তারা। সাজিদ এবং শাহজাদের মতো বোলারদের কড়া শাসন করে বাউন্ডারি আদায় করেছেন এই যুগল।
৯২ বলে ৫টি চারের মারে ৬৯ রান করে লিটন আউট হলেও অবিচল ছিলেন রহীম। তার ব্যাট যেন খাপখোলা তলোয়ারের মতো ঝলসে উঠেছে বারবার। উইকেটের এক প্রান্ত আগলে রেখে রানের চাকা সচল রাখেন তিনি। লিটন ফেরার পর ক্রিজে আসেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে তিনি বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। শাহজাদের শিকার হয়ে মিরাজ সাজঘরে ফিরলে দলের দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের কাঁধে তুলে নেন রহীম।
মিরাজ বিদায় নেওয়ার পর টেলএন্ডার তাইজুল ইসলামকে সাথে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান রহীম। অবিচ্ছিন্ন এই জুটিতে দলের স্কোরবোর্ডে মহামূল্যবান ৭৭ রান যোগ হয়। তাইজুল ৫১ বল খেলে ২ চারে ২২ রান করে যোগ্য সহায়তা প্রদান করেন। পাক বোলারদের ওপর রীতিমতো স্টিমরোলার চালিয়ে ২৩৩ বলে ১৩৭ রানের এক ঝলমলে ইনিংস উপহার দেন রহীম। ১২টি চার এবং ১টি ছক্কায় সাজানো ছিল তার এই দৃষ্টিনন্দন ইনিংসটি। শেষ পর্যন্ত সাজিদের বলে ডিপ মিডউইকেটে আব্বাসের হাতে ধরা পড়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি। তার বিদায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ দল তাদের ইনিংসের সমাপ্তি দেখার সুযোগ পায়।
প্রবল চাপ সামলে তিনি যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। এই কঠিন লড়াইয়ের সুবাদে স্বাগতিকরা ম্যাচে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। পাক বোলারদের মধ্যে শাহজাদ ৮৬ রান খরচায় ৪ উইকেট শিকার করে সফলতম বোলার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। অপরদিকে ১২৬ রানের বিনিময়ে ৩টি উইকেট ঝুলিতে পুরেছেন সাজিদ। পেসার হাসান আলী পেয়েছেন ২ উইকেট। বোলারদের এমন সম্মিলিত আগ্রাসন সত্ত্বেও রহীমের ইস্পাতদৃঢ় মানসিকতা আর নিখুঁত শট সিলেকশনের কাছে তারা একেবারেই অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। বিশাল লক্ষ্যের পাহাড় টপকাতে নেমে দিনের শেষ ভাগে চরম পরীক্ষার মুখে পড়েন পাকিস্তানের দুই ওপেনার আব্দুল্লাহ ফজল ও আজান আওয়াইস। রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই পেসারদের তোপের মুখে পড়েন তারা।
তাসকিন ও শরিফুলের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে প্রথম দুই ওভারেই কোনো রান তুলতে সক্ষম হয়নি সফরকারী দলটি। তাসকিন নিজের প্রথম ওভারটি পুরোপুরি মেডেন আদায় করে নেন। পরের ওভারে শরিফুলও দুর্দান্ত লাইন লেংথ বজায় রেখে মেডেন তুলে নেন। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ করার আগেই আলো স্বল্পতার কারণে আম্পায়াররা দিনের খেলা সমাপ্তি ঘোষণা করতে বাধ্য হন। ফলে ২ ওভার শেষে বিনা উইকেটে দিন শেষ করে অতিথি শিবির। জয়ের জন্য তাদের আরও প্রয়োজন ৪৩৭ রান। হাতে আছে পুরো দুটি দিন এবং ১০টি অক্ষত উইকেট। তবে চতুর্থ দিনে স্পিনারদের স্বর্গরাজ্যে স্বাগতিক বোলাররা যে রীতিমতো আগুন ঝরাবেন, তা বলাই বাহুল্য।
