রিফার্বিশড আইটি পণ্যে সয়লাব বাজার: দেশীয় শিল্পের অস্তিত্ব সংকটে, সরকার হারাচ্ছে ৫’শ কোটি টাকা রাজস্ব

রিফার্বিশড আইটি পণ্যে সয়লাব বাজার: দেশীয় শিল্পের অস্তিত্ব সংকটে, সরকার হারাচ্ছে ৫’শ কোটি টাকা রাজস্ব

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত নিম্নমানের রিফার্বিশড আইটি পণ্যের দাপট আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, অল-ইন-ওয়ান কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন কম্পিউটার হার্ডওয়্যার এখন গ্রে মার্কেটের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দেশে ঢুকছে এবং খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। কম দামের প্রলোভনে সাধারণ ক্রেতারা এসব পণ্য কিনলেও পরবর্তীতে প্রতারণা, দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া, ওয়ারেন্টি-সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অতিরিক্ত মেরামত ব্যয়ের মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে এ পরিস্থিতি দেশীয় আইটি উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পকে মারাত্মক চাপে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু বাজারের একটি অনিয়ম নয়; বরং দেশের রাজস্ব, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং পরিবেশ সব কিছুর জন্যই একটি বহুমাত্রিক হুমকি হয়ে উঠেছে।

৮ হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ আইটি পণ্যের বাজারের ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর
সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ এবং অল-ইন-ওয়ান কম্পিউটারের সম্মিলিত বাজারের আকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বছরে মোট প্রায় ৯ লাখ ইউনিট কম্পিউটার পণ্য বিক্রি হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল বাজারের প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানিনির্ভর, আর মাত্র ৮ শতাংশ আসে স্থানীয় উৎপাদন থেকে। একই বছরে বৈধ চ্যানেলে দেশে এসেছে প্রায় ৪ লাখ ইউনিট কম্পিউটার পণ্য। অন্যদিকে গ্রে মার্কেট বা রিফার্বিশড বাজারের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ লাখ ইউনিট। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত কম্পিউটারের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫ হাজার ইউনিট। স্থানীয় উৎপাদনকারীদের মধ্যে ওয়ালটন, ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স এবং স্মার্ট উল্লেখযোগ্য। এই চিত্র স্পষ্টভাবে দেখায়, বাজারে বৈধ আমদানি ও দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি অবৈধ প্রবেশ করা পণ্যের একটি শক্তিশালী সমান্তরাল সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অ্যাপল (ম্যাকবুক), এইচপি, ডেল এবং লেনেভোর মতো ব্র্যান্ডের পুরনো ও বাতিল পণ্যগুলো মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং ও চীন থেকে সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র লাগেজ নীতির অপব্যবহার করে কিংবা সরাসরি অবৈধ চ্যানেলে এসব পণ্য দেশে নিয়ে আসে। পরে ঢাকার মাল্টিপ্লান সেন্টার, মোতালেব প্লাজা, ইস্টার্ন প্লাস শপিং কমপ্লেক্সের মতো বড় আইটি মার্কেট ছাড়াও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন দারাজ, বিক্রয় ডটকম এবং বিভিন্ন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে “রিফার্বিশড”, “ইমপোর্টেড ইউজড”, “ফ্রেশ কন্ডিশন” বা “ওপেন বক্স” নামে বিক্রি করা হয়।

সরকার হারাচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব
রিফার্বিশড ও গ্রে মার্কেটের বিস্তার সরকারের রাজস্ব আয়েও বড় ধাক্কা দিচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, বৈধ চ্যানেলে আমদানিকৃত কম্পিউটার পণ্য থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। কিন্তু বাজারের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পণ্য অবৈধ বা অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করায় সরকার বছরে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অর্থাৎ শুধু ভোক্তা প্রতারণা বা শিল্পক্ষতির বিষয় নয়, এই অনিয়ন্ত্রিত বাজার রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাকেও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো
বর্তমান শুল্ক কাঠামো অনুযায়ী সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য বা সিবিইউ ইউনিট আমদানিতে বিভিন্ন পণ্যে মোট করের হার ভিন্ন। ল্যাপটপে মোট করভার প্রায় ২৩.২৫ শতাংশ। ডেস্কটপ ও অল-ইন-ওয়ান কম্পিউটারে এটি প্রায় ১৭.৮৮ শতাংশ। মনিটরে মোট করভার প্রায় ৩৯.৬০ শতাংশ, রাউটার ও নেটওয়ার্ক ডিভাইসে প্রায় ২০.২৫ শতাংশ, সিসিটিভিতে প্রায় ৩৯.৭৫ শতাংশ, প্রিন্টারে প্রায় ৩০.৬৩ শতাংশ এবং স্পিকারে প্রায় ৬১.৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। এই কাঠামোতে কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, ভ্যাট, অ্যাডভান্স ট্যাক্স ও অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা এসআরও সুবিধার আওতায় কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ আমদানিতে কিছু শুল্ক সুবিধা পান। তবে সব যন্ত্রাংশ এই সুবিধার আওতায় নেই। যেমন ডেস্কটপ কেসিং ও প্যানেল, মনিটরের স্ট্যান্ড এবং স্পিকারের ইলেকট্রিক ম্যাগনেটিক ড্রাইভার ইউনিট এখনো পুরোপুরি সহজলভ্য বা সুবিধাভুক্ত নয়। ফলে স্থানীয় উৎপাদকের খরচ বেড়ে যায়।

চাপে দেশীয় শিল্প
দেশীয় আইটি শিল্পোদ্যাক্তা নতুন কারখানা, প্রোডাকশন লাইন, জনবল, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছেন দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা সামনে রেখে। কিন্তু তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে কর-ফাঁকি দিয়ে আনা নিম্নমূল্যের রিফার্বিশড পণ্য। বৈধভাবে উৎপাদন প্রতিষ্ঠানকে শুল্ক, ভ্যাট, বিদ্যুৎ, জনবল, মাননিয়ন্ত্রণ এবং বিক্রয়োত্তর সেবার খরচ বহন করতে হয়। অন্যদিকে গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এসব দায় এড়িয়ে গিয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করে বাজার দখল করছে। এর ফলে স্থানীয় আইটি পণ্য উৎপদান শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কর্পোরেট বাজারেও রিফার্বিশড পণ্যের দখল বাড়ছে, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের গতি কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এতে বাংলাদেশকে আইটি পণ্য উৎপাদনের একটি আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

কম দামের আড়ালে প্রতারণার ফাঁদ
রিফার্বিশড পণ্যের বাজার বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দামের পার্থক্য। শুল্ক ও কর এড়িয়ে দেশে প্রবেশ করায় এসব পণ্য বৈধভাবে আমদানিকৃত নতুন পণ্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করা যায়। ফলে শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, নিম্ন ও মধ্যআয়ের চাকরিজীবী, এমনকি অনেক কর্পোরেট ক্রেতাও এসব পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। স্বল্প বাজেটে তুলনামূলক উচ্চ কনফিগারেশনের ডিভাইস পাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকেই এটিকে লাভজনক মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এই সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই সাময়িক। কারণ অধিকাংশ রিফার্বিশড পণ্যে অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি থাকে না। অনেক সময় নষ্ট বা দুর্বল ব্যাটারি, নকল র‌্যাম, থার্ড-পার্টি মাদারবোর্ড, নিম্নমানের ডিসপ্লে কিংবা রিপ্লেসড চার্জিং সার্কিট ব্যবহার করে পণ্য বিক্রি করা হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ডিভাইস বিকল হয়ে যায় এবং ক্রেতাকে আবারও নতুন করে খরচ করতে হয়।

বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
নিম্নমানের রিফার্বিশড আইটি পণ্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করতে পারে, যা ব্যাটারি লিকেজ, ফুলে যাওয়া, এমনকি বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের কারণও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের চার্জিং সার্কিট বা অ্যাডাপ্টার ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া ক্ষয়প্রাপ্ত বা নিম্নমানের ইলেকট্রনিক উপাদান থেকে সীসা, পারদ বা অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক নির্গত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘ সময় ব্যবহারে অনিয়ন্ত্রিত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যদিও এসব ঝুঁকির মাত্রা পণ্যের মান ও অবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে, তবু নিম্নমানের ও অযাচাইকৃত পণ্য যে ব্যবহারকারীর জন্য নিরাপদ নয়, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট।

ই-বর্জ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি
রিফার্বিশড বা নিম্নমানের ব্যবহৃত পণ্য দ্রুত নষ্ট হয়ে গেলে তা শেষ পর্যন্ত ই-বর্জ্যে পরিণত হয়। বাংলাদেশে এখনও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ও সুসংহত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে ল্যাপটপ, ব্যাটারি, প্রিন্টার, ডিসপ্লে ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের বর্জ্য মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ভারী ধাতুসমৃদ্ধ এসব বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

দেশীয় শিল্প রক্ষায় শিল্প বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

এই সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্টরা কয়েকটি তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন। বিশেষ করে বৈধভাবে আমদানিকৃত নতুন আইটি পণ্যের ওপর শুল্কহার এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে গ্রে মার্কেটের সঙ্গে দামের ব্যবধান অতিরিক্ত না থাকে; বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বড় আইটি মার্কেট ও অনলাইন বিক্রয় চ্যানেলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা; দেশে বিক্রিত আমদানিকৃত আইটি পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক মান সনদ চালু করার মাধ্যমে নিম্নমানের ও ব্যবহৃত পণ্য শনাক্তকরণ সহজতর করা; ভোক্তাদের অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি, ব্যাটারির নিরাপত্তা, মানসম্মত যন্ত্রাংশ এবং ভেজাল পণ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা; কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক-ভ্যাট সুবিধা, সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় পণ্যের অগ্রাধিকার, হাইটেক পার্ক সুবিধা এবং সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের আইটি বাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে সস্তা কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত রিফার্বিশড পণ্যের বিস্তার, অন্যদিকে রয়েছে দেশীয় উৎপাদনশীল শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভোক্তারা প্রতারিত হবেন, সরকার রাজস্ব হারাবে, পরিবেশে ই-বর্জ্যের চাপ বাড়বে এবং দেশীয় শিল্পের টেকসই বিকাশ ব্যাহত হবে।

অন্যদিকে এখনই কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ, কঠোর নজরদারি এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের উপযুক্ত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ শুধু নিজের বাজার রক্ষা করতেই সক্ষম হবে না, বরং ভবিষ্যতে আইটি হার্ডওয়্যার উৎপাদনে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন