ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে ভ্যাট ব্যবস্থা আধুনিকায়নের আহ্বান

ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে ভ্যাট ব্যবস্থা আধুনিকায়নের আহ্বান

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থা আবারও নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ভ্যাট কাঠামো সরলীকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা এবং ব্যবসাবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু করহার বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব নয়। বরং কার্যকর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ভ্যাট কাঠামো গড়ে তুলতে পারলেই দীর্ঘমেয়াদে করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং স্বেচ্ছায় কর পরিপালনের সংস্কৃতি তৈরি হবে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর) এবং ভ্যাট বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবনায় ভ্যাট আইনের কয়েকটি মৌলিক সংস্কারের বিষয় উঠে এসেছে।

এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সংজ্ঞা সরলীকরণ, আমদানির সংজ্ঞায় ডিজিটাল সেবা অন্তর্ভুক্ত করা, কর গণনা পদ্ধতি সহজ করা এবং টার্নওভার ও নিবন্ধন কাঠামো পুনর্বিন্যাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ভ্যাট ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আইনের জটিলতা এবং প্রশাসনিক ব্যাখ্যানির্ভরতা। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে এবং করদাতাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, সরকার রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি করব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে কাজ করছে। তার ভাষায়, “ভবিষ্যতের কর প্রশাসন হবে অটোমেশনভিত্তিক। আমরা এমন একটি ভ্যাট ব্যবস্থা চাই যেখানে করদাতা ও প্রশাসনের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমে আসবে এবং স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বাড়বে।” তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল সেবা ও সীমান্তপারের লেনদেন বাড়ার ফলে প্রচলিত ভ্যাট কাঠামোকে আধুনিকায়ন করা এখন বেশ জরুরি। তবে যেকোনো সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যবসা ও শিল্পখাতের সক্ষমতা বিবেচনায় নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য ভ্যাট ব্যবস্থার দাবি জানানো হচ্ছে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “কর আইন যত জটিল হবে, ব্যবসার ব্যয় তত বাড়বে। ভ্যাট ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যাখ্যানির্ভরতা কমিয়ে সরলতা আনতে হবে। কারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নীতির স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতাকে।” তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমান রিটার্ন ও নিবন্ধন ব্যবস্থা এখনও অনেক কঠিন। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর বাইরে থেকে যাচ্ছে। “করহার বাড়ানোর চেয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেয়া উচিত,” বলেন তিনি।

সিএসইআর চেয়ারপার্সন এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের চেয়ারম্যান সাকিফ শামীম বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ভ্যাট ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ব্যাপক ভিত্তি, স্বল্প জটিলতা এবং উচ্চ কমপ্লায়েন্স। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই দর্শন অনুসরণ করা প্রয়োজন। তার মতে, ভ্যাট আইনে “ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটি”-এর মতো জটিল ধারণা প্রশাসনিক ব্যাখ্যার সুযোগ বাড়ায়। এতে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং আইনের প্রয়োগে বৈষম্য দেখা দিতে পারে। ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশই সফটওয়্যার, ক্লাউড সার্ভিস, অনলাইন কনসালটেন্সি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশের ভ্যাট কাঠামো এখনও অনেকাংশে পণ্যকেন্দ্রিক। ফলে ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপে নীতিগত অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যাট কাঠামো সংস্কারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। কারণ আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা, কার্যকর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, স্বচ্ছ আপিল প্রক্রিয়া এবং করদাতাবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৬-২৭ বাজেট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এ বাজেটে যদি বাস্তবমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যবসাবান্ধব ভ্যাট কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যায়, তবে তা শুধু রাজস্ব বৃদ্ধি নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথও সুগম করবে। অন্যথায় জটিলতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে একটি রূপান্তরমুখী সময় অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজন ঘাটতির প্রেক্ষাপটে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট হবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান নীতি কাঠামো। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে।

ভ্যাট বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে কার্যকর পরোক্ষ কর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত। কারণ এটি উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে মূল্য সংযোজনের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করে এবং রাজস্ব আহরণে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা প্রদান করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি কার্যকর ভ্যাট ব্যবস্থা শুধু উচ্চ করহার নির্ধারণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং এর মূল শক্তি নিহিত থাকে আইনের সরলতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং করদাতার আস্থার মধ্যে।

বাংলাদেশে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ প্রণয়নের সময় একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কর কাঠামো তৈরির প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে আইনটির বহু ধারা, সংজ্ঞা এবং প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এমন এক জটিলতা তৈরি করেছে, যা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি করেছে এবং কর ব্যবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্নটি হলো- আমরা কি আন্তর্জাতিক মানের একটি ভ্যাট কাঠামো তৈরি করতে পারছি, নাকি স্থানীয় বাস্তবতা সেটিকে বারবার সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে?
এই প্রেক্ষাপটে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ ও ভ্যাট বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ বাজেট সুপারিশসমূহ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এই প্রস্তাবনাগুলো কেবল করহার পরিবর্তনের আলোচনা নয়; বরং ভ্যাট ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

প্রথমত, ভ্যাট আইনের জটিল ও অপ্রয়োজনীয় ধারণাগত কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে "অর্থনৈতিক কার্যক্রম" শব্দটির সংজ্ঞা বাতিল বা সরলীকরণের যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক ভ্যাট দর্শনের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ অধিকাংশ উন্নত অর্থনীতিতে ভ্যাটের মূল ফোকাস থাকে বা সরবরাহের ওপর- কোনো বিমূর্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ব্যাখ্যার ওপর নয়। প্রস্তাবনায় যুক্তি দেয়া হয়েছে যে, 'ভ্যাটযোগ্য সরবরাহ", "ভ্যাটমুক্ত সরবরাহ" এবং "সরবরাহ"- এই তিনটি বিষয় স্পষ্ট থাকলেই কর প্রশাসন কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।

সাকিফ শামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়িত হলে কর প্রশাসনের ব্যাখ্যা নির্ভরতা কমবে, ব্যবসায়ীদের কমপ্লায়েন্স ব্যয় হ্রাস পাবে এবং কর আইনের প্রয়োগে পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ও বৈশ্বিক অর্থনীতির বাস্তবতায় আমদানির সংজ্ঞা আধুনিকায়নের প্রস্তাব অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ডিজিটাল সেবা, সফটওয়্যার, ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন কনসালটেন্সি এবং সীমান্তপারের সেবা বিনিময়। অথচ বাংলাদেশের ভ্যাট কাঠামো এখনও মূলত পণ্যভিত্তিক চিন্তাধারার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রস্তাবনায় আমদানির সংজ্ঞায় সেবা আমদানিকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
সাকিফ শামীম বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কর কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ট্যাক্সেশনের আধুনিক নীতিমালার সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। একইসাথে বৈদেশিক ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রেও একটি স্পষ্ট নীতিগত ভিত্তি তৈরি হবে।

তৃতীয়ত, কর গণনার জটিলতা কমানোর প্রস্তাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের হিসাব পদ্ধতি ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বোধ্য। "কর ভগ্নাংশ" সংক্রান্ত প্রস্তাবে যে সরলীকরণ তুলে ধরা হয়েছে, তা কর নির্ধারণকে অধিক ব্যবহার বান্ধব করতে পারে।

চতুর্থত, টার্নওভার ও নিবন্ধন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এখনও আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করছে। এর অন্যতম কারণ হলো নিবন্ধন ও রিটার্ন ব্যবস্থার জটিলতা। প্রস্তাবনায় টার্নওভারের সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট করা এবং বাস্তব ব্যবসায়িক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামো তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

এটি কার্যকর হলে করভিত্তি সম্প্রসারণ সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা কেবল আইন নয়- বরং প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নীতির ধারাবাহিকতা। আন্তর্জাতিক মানের একটি ভ্যাট কাঠামো গঠনের জন্য ডিজিটাল অটোমেশন, তথ্যভিত্তিক অডিট, স্বচ্ছ আপিল ব্যবস্থা এবং করদাতাবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কৃতি অপরিহার্য। এই বাস্তবতায় অতিরিক্ত করচাপ বা জটিল ভ্যাট কাঠামো উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে, যা শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্বানুমানযোগ্য ভ্যাট নীতি এখন সময়ের দাবি।

২০২৬-২৭ বাজেট তাই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই বাজেটে যদি ভ্যাট কাঠামোকে বাস্তবমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যবসাবান্ধব করা যায়, তবে তা শুধু রাজস্ব বৃদ্ধি করবে না; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতাকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। অন্যথায়, জটিলতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের করব্যবস্থা রাজস্ব সংগ্রহের পরিবর্তে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার অন্যতম উৎস হিসেবেই থেকে যেতে পারে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন