কমলগঞ্জে যুবদল নেতার ছত্রছায়ায় অপরাধের অভয়ারণ্য

ফন্ট সাইজ:

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আলীনগর ইউনিয়নে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক আবসার মাহমুদ পাবেলের নিকটাত্মীয়দের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংঘবদ্ধ চক্র। গরু চুরি, ছড়ার বালু লুট, ভূমি দখল, বনজ সম্পদ লুণ্ঠন এবং জুয়ার আসর বসানোর মাধ্যমে পুরো এলাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে যুবদল নেতার নিকট আত্মীয়ের প্রভাবশালী পরিবারটি। আর এসব অপরাধে সায় দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক বরাবরে কমলগঞ্জের সুনছড়া চা বাগানের সুমন মিয়া নামের এক বাসিন্দার করা লিখিত অভিযোগে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জেলা প্রশাসক বরাবরে করা লিখিত অভিযোগে জানা যায়, আলীনগর ইউনিয়নের আলীনগর চা বাগান ও এর ফাঁড়ি সুনছড়া চা বাগান এলাকায় পানির মোটর ও টিউবওয়েল চুরি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বাগানের স্থানীয় কাজল হাজরা ও গোপেন উড়াংয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই চুরির সিন্ডিকেটটি পরিচালিত হচ্ছে। গত এক মাসে চুরির ভয়াবহতা আরও বেড়েছে। পাবেলের চাচাত ভাই মকবুল মিয়া, রসিদ উল্লাহ, ইব্রাহিম উল্লাহ, উসমান উল্লাহ ও ময়নুল মিয়ার নেতৃত্বে একটি দল সম্প্রতি চা শ্রমিক বাবুল রবিদাশ, সরজু রবিদাশ ও কার্তিক রবিদাশের ৪টি সহ একাধিক গরু চুরি করে। কিন্তু এসব চুরির বিষয়ে চা শ্রমিকরা থানা পুলিশকে বারবার অবগত করলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারণে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরবর্তীতে চুরিকৃত গরুগুলো পার্শ্ববর্তী কালিছালি আবাসনে তাদের সহযোগী শাহিনের হেফাজতে রেখে জবাই করে ভোজ করা হয়। ইতিপূর্বে সুনছড়া চা বাগানের বশির টেইলারের গরু চুরির ঘটনাটি জানাজানি হলে ৩০ হাজার টাকায় রফাদফা করা হয়। আলীনগর, সুনছড়া ও ডবলছড়া চা বাগানে প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক চৌকিদারি বাগিয়ে নিয়েছে পাবেলের চাচাতো ভাই রসিদ ও ময়নুল। বাগানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থেকেও তারা মূলত রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। গত বছরে জুলাই মাসে রসিদ ও ময়নুলের যোগসাজশে সুনছড়া চা বাগানের ১৪ নম্বর টিলা থেকে বড় একটি গর্জন গাছ চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের ভয়ে করো নাম উল্লেখ না করে থানায় অভিযোগ দায়ের করে। বিষয়টি পরবর্তী পাবেল মাটিচাপা দেওয়ায় পুলিীি তদন্ত আটকে যায়।
এছাড়াও আলীনগর, সুনছড়া ও ডবলছড়া এই তিনটি চা বাগান থেকে রসিদ ও ময়নুলকে দিতে হচ্ছে হাজিরা। তাদের সহযোগিতায় প্রতিনিয়ত বাগানের অসংখ্য মূল্যবান তরল রাবার ও রাবার গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সুত্রের তদন্তে জানা যায়। তবে এবিষয়ে রসিদ ও ময়নুল কোনো মন্তব্য না করে যুবদল নেতা পাবেলের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

অভিযোগের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি দখল ও সুনছড়ার বালু অবৈধভাবে লোটের অভিযোগও দীর্ঘ এই পরিবারের বিরুদ্ধে। চিৎলিয়ার মো. হাসমত উল্লাহর ১৫ শতক জমি জোরপূর্বক দখল করার অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। এছাড়া, পাবেলের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কালিছালি আশ্রয়ণ প্রকল্পের সামনের টিলা এবং কামারছড়া বনবিটের ১২ নম্বরে সরকারি জমি দখল করে টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছেন পাবেলের চাচাতো ভাই স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেন। বর্তমানে সেই ঘরে তার ভাই রুবেল বসবাস করছে। ২০২৪ এর ৫ই আগস্টের পর থেকে সুনছড়ার বালু অবৈধভাবে উত্তোলন করে বিক্রি করছে এ চক্রটি। পাবেলের আরেক চাচাতো ভাই উসমানের নেতৃত্বে কালিছালি আবাসন এলাকায় নিয়মিত জুয়ার আসর বসছে। এসব অপকর্মে সেলিম মিয়া ও সাকের মিয়াসহ কয়েক যুবকের নামও উঠে এসেছে। এই জুয়ার আসরকে কেন্দ্র করে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। জেলা প্রশাসক বরাবরে করা অভিযোগে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

আলাপকালে আলীনগর ইউনিয়ন যুবদলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মী জানান, যুবদলের আহ্বায়ক পাবেলের পরিবারের লোকজনের কাছে গোটা ইউনিয়নবাসী জিম্মি। দলের প্রভাব কাটিয়ে পাবেল পুলিশের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলায় তার চাচাতো ভাইয়েরা বাগানের গাছ চুরি, বালু লুট, জমি দখল ও গরু চুরি থেকে শুরু করে সকল অপকর্মে জড়িত রয়েছে। দলীয় পদ ও স্থানীয় এমপির ঘনিষ্ঠতা দাবি করে পাবেল নিজেকে আড়াল করে সকল অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করছে।

সুনছড়া চা বাগানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী ও শ্রমিক জানান, যুবদল নেতা পাবেলের ছত্রছায়ায় তার ভাই ও ভাতিজারা পুরো ইউনিয়ন জিম্মি করে রেখেছে। টিউবওয়েল থেকে শুরু করে গবাদিপশু চুরি বনের গাছ থেকে ছড়ার বালু লুট সবই হচ্ছে। কোনো কিছুর প্রতিবাদ করলেই ভয়ভীতি প্রদর্শন এমন কি মারধরের ঘটনাও ঘটে। তাদের কাছে কেউ নিরাপদ নয়। এবিষয়ে তারা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বাগান থেকে গাছ ও গরু চুরির বিষয়ে আলীনগর চা বাগানের ব্যবস্থাপক এজেএম রফিউল আলম বলেন, ‘আমার কিছু জানা নেই। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। তবে যদি চুরি হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত নিয়ে ব্যবস্থা করবো, প্রয়োজনে থানা পুলিশ করবো। লাইন চৌকিদার পরও শ্রমিকদের পানির মটর, টিউবওয়েল চুরির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে ব্যবস্থাপক এজেএম রফিউল আলম বলেন, এসবের তো আমি নিরাপত্তা দিতে পারবো না। মাল যার নিরাপত্তাটা তার। তাহলে লাইন চৌকিদার কি প্রয়োজন আছে এমন অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাদের মালামাল চুরি হয়েছে তারা থানায় অভিযোগ করুক।

অভিযোগ অস্বীকার করে আলীনগর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক আবসার মাহমুদ পাবেল বলেন, ওরা আমার গোষ্ঠীর মানুষ। তাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডে আমার সমর্থন বা জড়িত কোনটাই নেই। এক প্রশ্নের জবাবে যুবদল নেতা পাবেল বলেন- আমার রাজনীতির পার্ট একটি, তাদের আরেকটি। সাংবাদিক হিসেবে তাদের বিষয়ে আপনারা যতটুকু জানেন, আমিও ততটুকু জানি। তিনি বলেন, রাজনীতির পাশাপাশি আমি জব করি একটি পাঁচতারকা হোটেলে। জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার হচ্ছে। এরও অংশ হিসেবে এমন অভিযোগ করা হয়েছে। এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কমলগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান বলেন, আমার কাছে এ ধরনের কোন অভিযোগ আসেনি। যদি এসব কর্মকান্ডে সে জড়িত থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন