আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানেও থামছে না ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। রাজধানীর প্রধান সড়ক, অলিগলি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ কেউই রেহাই পাচ্ছেন না বেপরোয়া এই ছিনতাইকারীদের হাত থেকে। কখনো প্রকাশ্যে ব্যস্ত সড়কে, কখনো গলির নীরব রাস্তায় ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে লুটে নিচ্ছে সর্বস্ব। অনেককে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হচ্ছে। ভীতিকর এই ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
গত ১৬ই মে রাতে রাজধানীর শ্যামলী হাউজিং নদীর পাড় এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মোহাম্মদ হৃদয় (২১) নামের এক যুবক গুরুতর আহত হন। বর্তমানে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহত ওই যুবক সিটি করপোরেশনের সুইপার। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া তার সহকর্মী মো. মামুন বলেন, হৃদয়ের বাসা আদাবর-১০ এর বালুর মাঠে। শুক্রবার কাজ শেষে রাত ৮টার দিকে বাসায় যাওয়ার পথে আদাবর-১০ এর ৩ নম্বর গলির শ্যামলী হাউজিং এলাকায় ছিনতাইকারী কিলার আবু সাইদ, মাউরা সোহেল, শাহিন ও আমির হৃদয়ের রাস্তা অবরোধ করে মাথায় ও বাম হাতের কাঁধে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দিয়ে তার কাছে থাকা ২০ হাজার টাকা ও ২টি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। পরে আমরা খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল নিয়ে আসি।
দু’দিন আগে শ্যামলী শিশুমেলা এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে প্রধান সড়কের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিআরটিসি বাসের মধ্য থেকে কাজী আল আমিন নামে এক সংবাদকর্মীর ব্যাগ টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। শেরেবাংলা নগর থানায় এ বিষয়ে তিনি লিখিত অভিযোগও করেছেন।
গত ১১ই মে বিকালে মোহাম্মদপুর চান মিয়া হাউজিংয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী। কোচিং শেষ করে রিকশাযোগে বাসায় ফেরার পথে বিকাল ৫টা ৩৭ মিনিটের দিকে তিনি ছিনতাইয়ের শিকার হন। পরে থানায় গেলে মামলা না নিয়ে ভুক্তভোগীকে মোবাইল হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বলা হয়। ভুক্তভোগী সিদ্দিক শ্রেষ্ঠ বলেন, রিকশায় চেপে চান মিয়া হাউজিং এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তি ইচ্ছা করে তার রিকশার সামনে এসে দাঁড়ায়। এতে রিকশার চাকা তার গায়ে লাগলে তিনি রিকশাচালককে কিছু না বলে আমাকে গালাগালি শুরু করে। ওই সময় আশপাশে আগে থেকেই অবস্থান করা মুখে মাস্ক পরা আরও চারজন সেখানে যোগ দেয়। তাদের মধ্যে দুইজন রিকশায় উঠে ধারালো ছুরি দেখিয়ে যাত্রীকে ভয় দেখায় এবং তার মোবাইল ফোন, টাকা ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। পরে তার সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে এনআইডি কার্ড, ব্যাংকের এটিএম কার্ডসহ সবকিছু নিয়ে নেয়।
স্থানীয়রা বলছে, ‘দে ধাক্কা’ নামে একটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। মূলত, মোহাম্মদপুর বাঁশবাড়ি এলাকার শীর্ষ ছিনতাইকারী রাব্বি ওরফে ‘চৌদ্দ রাব্বি’ এবং ‘আগুন’ ওরফে ‘ধাক্কা আগুন’-এর নেতৃত্বে এই চক্র বাঁশবাড়ি, বাসস্ট্যান্ড, চান মিয়া হাউজিং ও শিয়া মসজিদ এলাকায় এই চক্রটি অভিনব কায়দায় ছিনতাই করে আসছে।
একইদিন ভোরে মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধাওয়া দিতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরাই। পরে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ সদস্যদেরকে গুলি পর্যন্ত ?ছুড়তে হয়েছে। ধানমণ্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ওইদিন ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় মোটরসাইকেল করে ছিনতাই করে বেড়াচ্ছিল একটি চক্র। তাদের আমাদের থানা পুলিশের টহল টিম ধাওয়া দিলে তারা মোহাম্মদপুর টাউন হলের দিকে চলে যায়। ওই সময় ধারালো অস্ত্র নিয়ে তারা পুলিশের ওপরই হামলা শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ এক ছিনতাইকারীর পায়ে গুলি করে তাকে আটক করে।
গত ৯ই মে ধানমণ্ডি ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে দিয়ে অটোরিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইয়ের শিকার হন পুলিশ স্টাফ কলেজে কর্মরত পুলিশ সুপার শামীমা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, অটোরিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা আমার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে। এবিষয়ে আমি ধানমণ্ডি থানায় লিখিত অভিযোগও করেছি। কিন্তু এখনো কোনো সন্ধান পাইনি। ৯ই মে ভোরে রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুর এলাকায় সুজন (২৫) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে আহত করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।
৮ই মে রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় চলন্ত ট্রেনের ভেতরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ওমর ফারুক শাওন (২৬) নামে যাত্রী আহত হয়েছেন। আহতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে রাত ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতের শ্বশুর নাহিদ হাসান বলেন, শাওন গাজীপুরের মৌচাক এলাকার ইউসুফ সরদারের ছেলে ও পেশায় ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী। শুক্রবার গাজীপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠেন তিনি। ট্রেনটি স্টেশন ছাড়ার পরই ৪ জন ছিনতাইকারী তাকে পেটে ছুরিকাঘাত করে।
এরপর তার কাছে থাকা নগদ তিন হাজার টাকা নিয়ে যায়। ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে রাজধানী জুড়ে। আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, শাহজাহানপুর, উত্তরা, মিরপুর, মগবাজার কোনো এলাকাই যেন নিরাপদ নয় সাধারণ মানুষের জন্য। প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ছিনতাইকারীরা।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেসবাহ উদ্দিন বলেন, ছিনতাইকারীদের ধরতে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অপরাধীকে আটক করে আদালতের মাধম্যে কারাগারে প্রেরণ করা হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের শনাক্ত ও মালামাল উদ্ধারে কাজ করছে পুলিশ। তবে অনেকেই আবার ভোগান্তির ভয়ে মামলা না দিয়ে শুধু জিডি করে। তারপরও আমরা সর্বদা চেষ্টা করে যাচ্ছি।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা ও স্বস্তি ফেরাতে কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে ঢাকা মহানগরীতে ১১ হাজার সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস ও ছিনতাই ঠেকাতে ৭শ’ সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। এগুলো স্থাপন করা হলে মহানগর আরও নিরাপদ হবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্লক রেইড অভিযান, পুলিশি টহল, বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

no need, i am man.
২ মাস আগেBangladesh-e Police Ki ''OLOOS" naki ?