এআই ক্যামেরায় সড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। সিগন্যালের লাল বাতি জ্বললেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে সব যানবাহন। অটো মামলার ভয়ে শুধু দিনের আলো নয়, গভীর রাতেও ট্রাফিক পুলিশবিহীন সিগন্যালে নিয়ম মেনে চলছেন চালকরা। লাল বাতি জ্বললেই কেউ আর সিগন্যাল ভেঙে সামনে এগুচ্ছেন না। এমন কী ফুটপাথেও উঠছেন না মোটরসাইকেল চালকরা।
গতকাল সরজমিন রাজধানীর অন্যতম যানজট এলাকা বিজয় সরণি মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, আগে যেখানে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারাতেও কাউকে থামানো যেতো না। গাড়ির পেছন পেছন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দৌড়ানোর পরও ফাঁক-ফোকর দিয়ে গাড়ি চলে যেতো। নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটতো। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই প্রতিটি যানবাহনই সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল করছে। সবার নজরে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি। লাল আলো জ্বললেই থেমে যাচ্ছে সবাই। আর সিগন্যাল লাইটের ওপরে দেখানো নির্দিষ্ট সময় পর পর সবুজ আলো চালু হওয়ার পরই সবাই সামনে এগুচ্ছেন। কেউ জেব্রা ক্রসিংও পার হচ্ছেন না।
পেছন থেকে তাড়া দিলেও কেউ সামনে এগুচ্ছেন না। এমনই একজন পাঠাও চালক সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, এখন ঢাকার প্রায় সব জায়গাতেই এআই ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। আইন অমান্য করলেই অটো মামলা দিয়ে দিচ্ছে। আগে পুলিশ সদস্যদেরকে তো মাঝে মধ্যে অনুরোধ করে রেহাই পাওয়া যেতো, কিন্তু এই ক্যামেরা তো কারোর কথা শোনে না। তিনি বলেন, দু’দিন আগে আমি বাংলামোটর যাওয়ার সময় প্রচণ্ড জ্যামে পড়ি। একটু আগে যাওয়ার জন্য ফুটপাথের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল উঠিয়েছিলাম।
দেখি রাতেই আমার ফোনে এসএমএস এসেছে, দুই হাজার টাকার জরিমানা। এরপর থেকে আমি আর কোনো সিগন্যাল ভাঙিনি। ভাঙবোও না। তিনি বলেন, শুধু আমি না কেউই এখন আর সিগন্যাল ভাঙছে না। সবাই সতর্ক হয়ে গেছে। লিয়াকত আলী নামে আরেক প্রাইভেটকার চালক বলেন, আগে তো যে কেউ সুযোগ বুঝে ট্রাফিক আইন অমান্য করে চলে যেতো। ক্ষমতাশালী হলে তো কোনো কথাই নেই। ট্রাফিক পুলিশকেও তারা মান্য করতো না। আর এতে যেমন সড়কে দুর্ঘটনা ঘটতো, তেমনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো আমাদের। আর এখন তো ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়েছে। ক্যামেরা তো আর কাউকে চিনে না। যে আইন অমান্য করবে তার বিরুদ্ধেই মামলা হবে। উপরন্তু সিগন্যাল লাইটের দিকে তাকালেই দেখা যায়, কতো সময় জ্যামে বসে থাকতে হবে।
ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গেও তেমন কোনো বিবাদ নেই। সব মিলে এই এআই ক্যামেরা প্রযুক্তিটি একটি ভালো ও সময় উপযোগী উদ্যোগ। গতকাল বিজয় সরণি মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. আলমাস বলেন, আগে সড়কে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কাগজের স্লিপে মামলা দেয়া হতো। পরে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সিস্টেমের অংশ হিসেবে পজ মেশিন চালু হয়। এতে সড়কের মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মামলা দিতে যেমন আমাদের সময় ব্যয় হতো, তেমনই যানজটও বাড়তো। কিন্তু এখন এআই ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো ট্রাফিক সিস্টেম ডিএমপি হেডকোয়ার্টার থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কেউ আইন ভাঙলেই অটো মামলা হয়ে যাবে। কোনো ছাড় নেই।
আমাদের কাছে অনুরোধ তো দূরের কথা আমরাও কারোর জন্য কোনো অনুরোধ করতে পারবো না। কোনো কিছু আর আগের মতো আমাদের হাতে নেই। বিজয় সরণির মতো রাজধানীর আরেক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ফার্মগেট এলাকাতেও দেখা যায় একই চিত্র। বিজয় সরণি, খামারবাড়ি কিংবা কাওরানবাজার যেদিক থেকেই যানবাহন আসুক না কেনো, সবারই চোখ ট্রাফিক সিগন্যালে। লাল আলো জ্বলে উঠলেই কেউ আর সাদা দাগ পার হচ্ছে না। নাজমুল হাসান নামে এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, আমি বেতনভুক্ত কর্মচারী। গাড়ি আমার মালিকের। মালিক বলেছেন, সিগন্যাল মেনে যেনো গাড়ি চালাই। ক্যামেরাই নাকি অটো মামলা দিচ্ছে। তাই কেউ বললেও সিগন্যাল ভেঙে সামনে এগুই না। কারোর বেশি তাড়া থাকলে বলি, আপনি চলে যান, আমি যাবো না।
কারণ সিগন্যাল ভাঙলে মামলার টাকা আমাকেই দিতে হবে। বাংলামোটর এলাকায় রাস্তা পার হওয়া মাসুম নামে এক পথচারী বলেন, আগে তো রাস্তা পার হতে অনেক সমস্যা হতো। ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি দাঁড় করানোর সিগন্যাল দিলেও কেউ মানতো না। মোটরসাইকেলগুলো পাশ কাটিয়ে চলে যেতো। অনেক সময়ই গায়ের ওপর এসে পড়তো গাড়ি। খুব ভয় লাগতো। তবে ক্যামেরার কারণে পুরোপুরি না হলেও আগের তুলনায় এখন অনেকটাই স্বস্তি মিলছে। বেশির ভাগ চালকই এখন সিগন্যাল মেনে চলছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, ঢাকার রাস্তার শৃঙ্খল ফেরাতে গত ৭ই মে থেকে ট্রাফিক ব্যবস্থায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর গুলশান-১, গুলশান-২, উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, রামপুরা ট্রাফিক বক্স, মহাখালী, শাহবাগ, হাইকোর্ট ক্রসিং, সচিবালয় সিগন্যাল, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, পুলিশ ভবন, পুরাতন রমনা থানা ক্রসিং, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর রোডের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, গাবতলী ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিসহ গুরুত্বপূর্ণ ১০৫ পয়েন্টে এআই ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। পিটিজেড এসব ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পড়া, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং ও অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করছে।
চলন্ত বস্তু বা ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসরণের পাশাপাশি অপটিক্যাল জুমের মাধ্যমে অনেক দূর থেকেও স্পষ্ট ছবি বা গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করা সম্ভব। ফলে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের বাঁশি বা হাতের ইশারা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হচ্ছে ট্রাফিক আইন ভাঙার দৃশ্য। পরে সেই ফুটেজ যাচাই-বাছাই শেষে দেয়া হচ্ছে ডিজিটাল মামলা। গত এক সপ্তাহে এআই ক্যামেরার সাহায্যে প্রায় ১০ হাজারের বেশি ট্রাফিক আইন অমান্যের ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তিন হাজারের বেশি ফুটেজ দেখা হয়ে গেছে। বর্তমানে সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে ট্রাফিক পুলিশের টেকনিক্যাল টিম (টিটিইউ)। যাচাই শেষে আইন অনুযায়ী মামলা ও নোটিশ পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এআই প্রযুক্তির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ বলেন, রাজধানীতে স্থাপন করা এসব ক্যামেরায় ব্যবহার করা হচ্ছে ‘রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার’।
ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের নম্বর প্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সেই তথ্য যাচাই-বাছাই করে সম্পন্ন করা হচ্ছে মামলার প্রক্রিয়া। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের মোবাইলে এসএমএস এবং ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন অমান্যের ফুটেজ পাওয়া সবার বিরুদ্ধেই এখন ঢালাভাবে মামলা দেয়া হচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে যারা বেশি আইন অমান্য করেছে শুধু তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে। আমরা চাচ্ছি, মানুষের মধ্যে যেন সচেতনতা বৃদ্ধি হয়। তবে ভবিষ্যতে যারা আইন ভাঙবে তাদের সবার বিরুদ্ধেই মামলা হবে। তবে জরুরি সেবাদানকারী যানবাহনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে না বলেও যোগ করেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশ ভালো রেসপন্স পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় সব সিগন্যালে বেশির ভাগ চালক আইন মানছেন, এটি পজিটিভ একটি দিক। তবে নতুন এ ব্যবস্থায় কিছু জটিলতাও সামনে এসেছে। অনেক যানবাহনের নম্বর প্লেট অস্পষ্ট, আবার কিছু গাড়িতে নম্বর প্লেটই নেই। অনেক চালক নির্ধারিত নম্বর প্লেট ব্যবহার না করে শুধু পেইন্ট দিয়ে গাড়ির নিবন্ধন নম্বর লিখে যানবাহন চালাচ্ছেন।
আবার অনেক যানবাহনের মালিক নম্বর প্লেটের ফি পরিশোধ করলেও বিআরটিএ থেকে নির্ধারিত নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ সংগ্রহ করেননি। বিভিন্ন যানবাহনের উইন্ডশিল্ডে স্থাপিত আরএফআইডি ট্যাগ অকার্যকর পাওয়া যাচ্ছে, যা মহানগরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করছে। তাই চলতি সপ্তাহ থেকে অভিযানে নামছে পুলিশ। একইসঙ্গে যানবাহনের মালিক ও চালকদের বিআরটিএর নির্ধারিত ডিজাইন, রং ও সাইজের নম্বর প্লেট নির্ধারিত স্থানে স্থাপন এবং আরএফআইডি ট্যাগ কার্যকর আছে কি না তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Nizamul Haidar
২ মাস আগেআপনার এই রিপোর্ট বাস্তবতার সাথে কোন মিল নাই