পাকিস্তানের পেস তোপে একে একে সাজঘরে ফিরছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা, তখন দলের ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হলেন লিটন কুমার দাস। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচা যখন ধ্বংসস্তূপ এবং স্বাগতিকরা ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে, ঠিক তখনই খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলেন লিটন। প্রবল চাপের মুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করে এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার তুলে নেন টেস্ট ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ সেঞ্চুরি। শেষ পর্যন্ত লিটনের অনবদ্য সেঞ্চুরিতে ভর করে প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রানের লড়াকু সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। ১৫৯ বলের ইনিংসে লিটন করেন ১২৬ রান। পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি তার ৩য় সেঞ্চুরি। দিনের শুরু থেকেই খুররাম শাহজাদ ও মোহাম্মদ আব্বাসদের আগুনে বোলিংয়ে দিশাহারা ছিল স্বাগতিক শিবির।
সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল এই ডানহাতি ব্যাটার। একপ্রান্তে সতীর্থদের বিদায়ের মিছিল চললেও লিটন ছিলেন অবিচল। পরিস্থিতি বুঝে কখনো খোলসে ঢুকেছেন, আবার কখনো চড়াও হয়েছেন প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর। তার ইনিংসে ছিল ১৬টি দৃষ্টিনন্দন চার ও ২টি বিশাল ছক্কার মার।
সিলেটে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা। ম্যাচের মাত্র দ্বিতীয় বলে রানের খাতা খোলার আগেই আব্বাসের শিকার হয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়। এরপর অভিষিক্ত তানজিদ হাসান সাবলীল শুরু করলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ব্যক্তিগত ২৬ রানে ওই আব্বাসের বলেই ফিরতি ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি। অভিজ্ঞ মুমিনুল হক ২২ রান করে শাহজাদের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড হন। মধ্যাহ্নবিরতির পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহীম প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শান্ত ২৯ রান করে আব্বাসের তৃতীয় শিকারে পরিণত হন।
বিদেশের মাটিতে এটি ছিল টেস্টে আব্বাসের ১০০তম উইকেট। এরপর শাহজাদের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে ২৩ রানে বিদায় নেন মুশফিক। মেহেদী হাসান মিরাজ ক্রিজে এসে মাত্র ৪ রান করেই ডিপ ফাইন লেগে ক্যাচ তুলে দেন। ফলে মাত্র ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে গভীর সংকটে পড়ে যায় স্বাগতিক শিবির। তবে একপ্রান্ত আগলে রাখেন লিটন। টানা উইকেট পতনের ওই চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তে তাইজুল ইসলামকে সঙ্গী করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করেন লিটন। ৭ম উইকেটে তারা দুজন মিলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৬০ রানের একটি জুটি গড়েন, যেখানে লিটন ছিলেন দারুণ কৌশলী। অফ স্পিনার সাজিদ খানের বিপক্ষে তাইজুলকে আড়াল করে রাখতে বেশিরভাগ বল নিজেই খেলছিলেন। ওভারের শুরুতে বাউন্ডারির চেষ্টা করেছেন এবং শেষ বলে সিঙ্গেল নিয়ে নিজের কাছে স্ট্রাইক ধরে রাখেন। এরপর সাজিদের বলে তাইজুল ১৬ রান করে বোল্ড হলে ভাঙে এই অসাধারণ জুটি। তাসকিন আহমেদ ৭ রানে সাজঘরে ফিরলে দ্রুত গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কা জাগে।
তবে নবম উইকেটে শরিফুল ইসলামকে নিয়ে ফের দারুণ এক জুটি গড়েন তিনি। এই জুটিতে আসে মূল্যবান ৫৭ রান। ১১ রানে অপরাজিত থেকে তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন শরিফুল। লিটনের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিংয়ের সুবাদেই দল ২০০ রানের গণ্ডি পার করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এরপর তিনি সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যান প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবং ক্যারিয়ারের স্মরণীয় এক মাইলফলক স্পর্শ করেন।
ইনিংসের ৭০তম ওভারে শাহজাদের বলে দুর্দান্ত এক কাভার ড্রাইভে চার মেরে কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন লিটন। সেঞ্চুরির পর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি।
পরের বলেই বিশাল এক ছক্কা হাঁকিয়ে নিজের স্বভাবজাত আগ্রাসী রূপ দেখান। শেষ পর্যন্ত পেসার হাসান আলীর একটি শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে থামে তার এই মহাকাব্যিক ইনিংস। ১৫৯ বল মোকাবিলা করে ১২৬ রানের এক ঝলমলে ইনিংস উপহার দেন তিনি। তার বিদায়ের পর নাহিদ রানাও দ্রুত সাজঘরে ফিরলে ২৭৮ রানে থামে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস। সিলেটে টেস্ট প্রথম দিন শেষে এখন বোলারদের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ। কারণ প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ের পর লিটন কুমার দাস একাই দুর্দান্ত লড়াই করেছেন।
তার নান্দনিক সেঞ্চুরিতে স্বাগতিকদের স্কোরবোর্ডে প্রথম ইনিংসে জমা পড়েছে ২৭৮ রান। জবাবে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান তাদের প্রথম ইনিংসে কোনো উইকেট না হারিয়ে ২১ রান নিয়ে দিন শেষ করে। সফরকারীরা প্রথম ইনিংসে এখনো ২৫৭ রানে পিছিয়ে থাকলেও তাদের হাতে সব উইকেট অক্ষত আছে। এবার ব্যাটারদের ব্যর্থতায় চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে ‘টাইগার’ বোলারদের।

BAD MOUTH
২ মাস আগেনামই তার আসল পরিচয়। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।