এক সন্তানকে হারিয়ে আরেক সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই

এক সন্তানকে হারিয়ে আরেক সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই

ফন্ট সাইজ:

ক’দিন আগেও যমজ দুই সন্তানকে নিয়ে ছিল মায়ের ব্যস্ততা, হাসি আর আনন্দ। কিন্তু হামের থাবায় খালি হয়ে গেছে সেই মায়ের বুক। এক সন্তানকে হারানোর শোক বুকে চাপা দিয়েই আইসিইউতে ভর্তি আরেক সন্তানকে বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সাত মাস বয়সী যমজ শিশু ফাতেমা মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেও তার বোন খাদিজার হাম থেকে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত। মুখে অক্সিজেন মাস্ক ও হাতে ক্যানোলার যন্ত্রণা। শিশুটির জ্বর-ঠান্ডা, শরীরের লালচে দানা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে। বর্তমানে সে ঢাকার মাতুয়াইল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
শিশুদের মা সোনিয়া আক্তার বলেন, আমার একটা হাসি নিভে গেছে। এই কষ্ট আমি কি করে সহ্য করবো। আরেকটি হাসিকে সুস্থ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আমার কোলজুড়ে যেন এই সন্তানটি থাকে। দিনরাত এই প্রার্থনা করছি- সৃষ্টিকর্তার কাছে। ফুটফুটে শিশু দুটি সবসময় ঘর মাতিয়ে রাখতো। আমার স্বামী মোজাম্মেল হক নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া এলাকায় একটি মসজিদে ইমামতি করেন। আমাদের তিন মেয়ে, তিন বছরের আয়েশাও অসুস্থ। আর সাত মাস বয়সী যমজ খাদিজা ও ফাতেমা। তারমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে ২৩শে এপ্রিল ফাতেমা মারা যায়। প্রথমে জ্বর আসে দুই মেয়ের। সাধারণ জ্বর ভেবে নেয়া হয় ডাক্তারের কাছে। সেখান থেকে কিছু মেডিসিন দেয়া হয়। ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট, শরীর দুর্বল হতে থাকে। পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে আবার চিকিৎসকদের কাছে যাই। তাদের সঙ্গে কথা হয় ৩রা এপ্রিল ভর্তি করানো হবে। কিন্তু তার আগেই ১লা এপ্রিল রাতে হঠাৎ খাদিজার অবস্থা খারাপ হতে থাকলে আবার হাসপাতালে যাই।

তারা ৩রা এপ্রিল ভর্তির করানোর কথা বলেন। অবস্থা আবার খারাপ হতে থাকলে সেদিন রাতেই শ্যামলীর শিশু হাসপাতালের নিয়ে গেলে বেড পাওয়া যায়নি। এ সময় আমি খাদিজাকে কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছি এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে। তখন তার হাতে ক্যানোলা, নাকে অক্সিজেন। এর আগে তিন হাসপাতালে ঘুরেও বেড পাইনি। শেষে কোনোমতে একটা বেড পেয়ে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। এরপর খাদিজাকে ভর্তি করিয়ে ফাতেমাকে ভর্তি না নেয়ায় তাকে নিয়ে বাড়িতে যাই।

তিনি বলেন, ৮ই এপ্রিল আবার শিশু হাসপাতালে আনা হয় ফাতেমা ও তার বড় বোন আয়েশাকে। সেদিনও দেখি বেড নেই। পরে অন্য একটি ওয়ার্ডে জায়গা পাই। অক্সিজেন কমে গেলে ফাতেমাকে হাম ওয়ার্ডে নেয়া হয়। দেখা যায় তার শরীরে লাল গোটা দেখা যায়। খাদিজা আর আয়েশা শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। ওর জ্বর কমছিল না ১০২, ১০৩ থাকতো। তিনি বলেন, এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে ঘোরানো হয়েছে। এমনকি পরীক্ষার রিপোর্ট আসার পরও তা সময়মতো দেখা হয়নি। এ সময়ে মেয়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। খাবার দেয়ার সময় নল দিয়ে যেখানে ৫ এমএল দেয়ার কথা, সেখানে ২০ এমএল দেয়া হয়। এরপর বাচ্চার খাদ্যনালীতে খাবার চলে যায়। পরে অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। আইসিইউ পাওয়া যায়নি। শুরু হয় আইসিইউ’র জন্য যুদ্ধ। মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকার একটি হাসপাতালে নেয়া হয় ফাতেমাকে। সেখানে আইসিইউ পেলেও চার-পাঁচদিনে বিল আসে ৮০ হাজার টাকা। ঋণ করে এই টাকা জোগাড় করা হয়। পরবর্তীতে নেয়া হয় শ্যামলীর আরেকটি হাসপাতালে। সেখানেও একদিনে ১৫ হাজার টাকা বিল আসে। নিজের স্বর্ণের গহনা বিক্রি করে দেই সন্তানদের চিকিৎসার জন্য।

সোনিয়া আক্তার বলেন, এরপর সাইনবোর্ড এলাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করাই। সে সময় ভর্তি ছিল চারদিন। সেখান থেকে জানানো হয়- রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে গেছে, নিউমোনিয়া সমস্যা দেখা গেছে। সঠিক চিকিৎসা হয়নি। সেদিন সন্ধ্যায় লাইফ সাপোর্টে নেয়ার কথা জানায়। কিছুতেই কিছু হয়নি, শেষ পর্যন্ত আমার কোলটা খালি হয়ে যায়, ফাতেমা মারা যায় ২৩শে এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে। তাকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকায় গাউসিয়ার বাড়িতে দাফন করা হয়। চার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও মেয়েটিকে বাঁচাতে পারলাম না।

বর্তমানে খাদিজা হাসপাতালে ভর্তি। হামের পরে তার নিউমোনিয়া দেখা দিয়েছে, অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। শিশু হাসপাতালে ১২ দিন ভর্তি থাকার পর খাদিজাকে বাড়ি নেয়া হয়। এরপর আবার শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। অনেক দুশ্চিন্তায় আছি এই মেয়েকে নিয়ে। এক মেয়েকে তো হারাতে হলো আমার এই মেয়েটা যেন আমাদের কোলজুড়ে থাকে। সারাক্ষণ খুব ভয় হয় আমার আরেকটা মেয়ে চোখের সামনে চলে গেল। এই দৃশ্য মা হয়ে কীভাবে সহ্য করবো। দিন-রাত শুধু মেয়ের মুখটা চোখের সামনে ভাসছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন