হাসিনা-ইনান কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ ও হত্যার পরিকল্পনার কথা  উঠে আসে

জবানবন্দিতে শহীদ হাদি

হাসিনা-ইনান কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ ও হত্যার পরিকল্পনার কথা উঠে আসে

ফন্ট সাইজ:

জুলাই আন্দোলন চলাকালে ১৭ই জুলাই ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ইনান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে আন্দোলনকারীদের হত্যা করা হবে, কীভাবে সাফ করা হবে, কীভাবে আক্রমণ করা হবে, সে বিষয় নিয়ে সরাসরি ফোনে কথা বলেছেন। যার কল রেকর্ড আমরা আল জাজিরা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনেছি। সেক্রেটারি হিসেবে ইনান ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছিলেন শহীদ ওসমান হাদি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় তিনি গত বছরের ২রা অক্টোবর এ জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা আহমেদ নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ হাদির এ জবানবন্দী রেকর্ড করেন। প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ এর ১৯(২) ধারা অনুযায়ী হাদির এ জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল শহীদ হাদির জবানবন্দি গ্রহণের এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন-অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
জবানবন্দিতে হাদি আরও বলেন, ‘আমাকে অসংখ্য নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে শাহবাগ থানায় আমি জিডিও করেছি। অতি দ্রুত যদি তাদের বিচার না করতে পারি, তাহলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভবিষ্যতে কী পরিমাণ গণহত্যা চালাবে, তা অকল্পনীয়। তাদেরকে বিচারের আওতায় না আনলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে। এই আন্দোলনে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ থেকে বহু সাংবাদিক, লেখক ও অ্যক্টিভিস্ট অবদান রেখেছেন। যেহেতু আমি আইএলটিএস-এ পড়াতাম, সেহেতু আমার অনেক স্টুডেন্ট বিদেশে ভালো ভালো জায়গায় আছে, তাদের থেকেও আমি বিভিন্ন ইনফরমেশন পেতাম।’
নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে হাদি বলেছিলেন, আমার ডাক নাম শরীফ ওসমান হাদী। ছোট বেলা থেকে ঝালকাঠি শহরের ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করি। আলিম পাশ করে আমি ঢাকায় আসি। পরবর্তীতে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ সেশনে ভর্তি হয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে অনার্স মাষ্টার্স শেষ করি। বর্তমানে আমি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন থেকে শুরু করে আমি বিভিন্ন কালাচারাল একটিভিএমের সাথে জড়িত ছিলাম। কবিতা লেখালিখি’সহ বিশেষ করে আজকে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে, সেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যখন যে সুযোগ এসেছে, কখনো কবিতা, গল্প, গানে, প্রোগ্রামে সেই কালচারাল মুভমেন্টের সাথে যুক্ত থেকেছি। সব সময় অংশগ্রহন করার চেস্টা করেছি।
জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান দাবী হাদি বলেছিলেন, ২০২৪ এর কোটা আন্দোলনের শুরু থেকেই আমি ফ্যাসিবাদী বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। শুধু বাংলাদেশেই কোটাটা হিসাব করা হয় বিসিএস ক্যাডারের হিসাবটা করে। কিন্তু বিসিএস বা নবম গ্রেডের চাকুরিই সরকারী চাকুরী নয়, এখানে প্রাথমিক থেকে শুরু করে, খাদ্য থেকে শুরু করে অনেক ধরনের চাকরি আছে, প্রায় ৮০% বিভিন্ন ধরনের কোটা ছিল। এছাড়া ৯ম গ্রেডের বিসিএসের সেখানে ১ম এবং ২য় গ্রেডের ৫৪% এর বেশি বিভিন্ন ধরনের কোটা দিয়ে দখল করা ছিল।
তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে, বৈষম্যবিরোধী একটি সমাজ গড়তে চেয়েছিলাম, সেখানে বিভিন্ন ধরনের কোটা দিয়ে দিয়ে মেধাবী ছেলে মেয়েরা অনেক পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার ৫৪ শতাংশের ও বেশি বিভিন্ন কোটা দিয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, পরবর্তীতে তাদের সন্তানদের না পেয়ে তাদের নাতি ইত্যাদি নামে ব্যবহার করে সরকারি প্রায় সকল খাতে তার দলীয় পোলাপানদের নিয়োগ দেয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। এদিকে আবার মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% ছিল। তারপর বহুত লোক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট তৈরী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যদি এমন ৩০% কোটা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তার নাতি-পুতিদের জন্য না রাখা হতো, তাহলে এমন মিথ্যে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেয়া লাগতো না। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা শেষ করি, শেখ হাসিনা সরকার আদালতের ঘাড়ে বন্ধুক রেখে ২০১৮ সালের পরিপত্র বাতিল করে দিয়েছে। তখন সারাদেশের স্টুডেন্টরা প্রতিবাদ করলেও কোন ফল পায়নি। বঙ্গ ভবন পর্যন্ত স্মরকলিপি দিলেও কোন কার্যকর ফলাফল পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অযুহাতে তারা মানুষের জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলতো।
শহীদ হাদি বলেন, আন্দোলন চলাকালে ১৪ই জুলাই যখন আন্দোলন অনেকটা জোরালো হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টরা হলের গেইট ভেঙে রাস্তায় নেমে পড়ে এবং শ্লোগান দেয়, তুমি কে আমি কে? রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার। তখন আমি রামপুরা ছিলাম। ঐ মুহূর্তে আমি এবং আমার বন্ধু দ্রুত সিদ্ধান্ত নেই যে, আমরা ক্যাম্পাসে যাবো। তখন আমরা একটা রিক্সা নিয়ে কাকরাইল এবং মৎস্য ভবনের সামনে আসলে দেখি যে, রামদা, পিস্তল, চাপাতি, বড, হকিস্টিক নিয়ে যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। ঐখান থেকে আমরা ঢুকতে না পেরে হাইকোর্টের সামনে গিয়েও দেখি সেইম অবস্থা। তখন আমি আমার ছোট ভাই সমন্বয়ক আক্তারকে কল দিয়ে বলি যে, এখানকার পরিস্থিতি বেশি ভালো না। ছাত্রলীগ, যুবলীগ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছে তোমাদের আক্রমন করার জন্য। তোমরা দ্রুত কর্মসূচি শেষ কর। একটু পরে আক্তার আমাকে কল করে বলে যে, ভাই আপনাদের আসার দরকার নাই। আমরা প্রেগ্রাম শেষ করে দিয়েছি। সেদিন যুবলীগের সভাপতি পরশ, সেক্রেটারি নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম, সেক্রেটারি ইনান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত’গণের নেতৃত্বে মিছিল করে এবং স্টুডেন্টদের দেখা নেওয়ার হুমকি প্রদান করে। আমরা দেখেছি যে, শুধু মাত্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীই তো শুধু গুলি করেনি। তাদের বাহিরেও আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে আন্দোলনকালীন সময় বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছে। আমরা দেখেছি নিখিল তার হাতে অস্ত্র নিয়ে গুলি করেছে। ফেনীতে ০৭ জন, লক্ষীপুরে ০৬ জন, ফেনীতে, কুমিল্লা দেবিদ্বারে এমপি নিজে গুলি লোড করছে। সব জায়গায় ই তো আওয়ামীলীগ এর সন্ত্রাসীরা স্টুডেন্টদের গুলি করে মেরেছে। তাছাড়া আওয়ামী দলের সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের ১৪ই জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর তিনি বলেন যে, আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য ছাত্রলীগ ই যথেষ্ট। তার মানে তিনি একজন নন আর্মড অর্থাৎ একটি বেসামরিক ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হত্যা করার একটা বৈধতা দিয়ে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছিলেন শহীদ হাদি।
তিনি আরও বলেন, ১৮ জুলাই কারফিউ জারি করা নিয়ে ১৪ দলের সাথে ওবায়দুল কাদের মিটিং দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিলেন। জুলাই এর শেষের দিকে কারা শহীদ হয়েছেন? তখন রিক্সাওয়ালা, দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী, শ্রমিক, শিশু। অর্থাৎ তখন এই আন্দোলন শুধু স্টুডেন্টদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তখন ১৭ বছরে যারা গুম হয়েছে, ক্রসফায়ার করেছে, জেলের মধ্যে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের সন্তান, আত্মীয়-স্বজন এবং বিরোধী দল, যারা ন্যায্য বিচার পায়নি স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে তারাই রাস্তায় নেমে এসেছিল।

৩ আগস্ট আওয়ামীলীগের দলীয় কার্যালয় থেকে ওবায়দুল কাদের মহানগর থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। ৪ঠা আগস্ট ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা জেলায় অস্ত্র নিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে আক্রমন করে হত্যা করেছে। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য প্রতি পয়েন্ট এক্সিকিউট করার দায়িত্ব ছিল বাহাউদ্দিন নাসিম। বাহাউদ্দিন নাসিমকে দলের সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যেই স্বেচ্ছাসেবক লীগ বহু মানুষকে হত্যা করেছে, তিনি সেই স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এছাড়া ছাত্রলীগের ইনান তার হাতে রিক্রুট। সেই কারনে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ ও তার হাতে ছিল। প্রত্যেকটা গণহত্যাকে সে লীড দিয়েছে, এক্সিকিউট করেছে এবং সে শেখ হাসিনার কাছে রিপোর্ট করতো। এছাড়া যুবলীগের সভাপতি পরশ সম্পর্কে হাদি বলেছিলেন যে, পরশ এর বড় পরিচয় সে শেখ হাসিনার আত্মীয়। মেয়র তাপসের বড় ভাই। এসব পরিচয়ের কারণে তাকে অনেক মন্ত্রীদের চেয়েও পাওয়ারফুল করেছে। ঢাকার দখলবাজি, হত্যাকান্ডে যুবলীগ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতো। ১৫ই জুলাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বোনদের উপর যে হামলা হয়েছিল, সেটি তার নির্দেশেই হয়েছিল। সারাদেশে উস্কে দিয়ে তিনি তার দলীয় বাহিনী দিয়ে অসংখ্য হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন। ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মিছিল হয়েছিল, সেটা যুবলীগের সেক্রেটারি নিখিলের নেতৃত্বেই হয়েছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন হাদি।
আসামিদের বিচার চেয়ে হাদি বলেছিলেন, সারাদেশে আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত, পরিকল্পিত গণহত্যাকাণ্ডসহ বর্বরোচিত হামলার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, ছাত্রলীগ সাধারণ্য সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ ঘটনায় জড়িত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আওয়ামী লীগ দলীয় ক্যাডারদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।


Wasim Hussain

৫ মাস আগে

Hadi told the truth. The criminals should hang till death after prosecution

মন্তব্য করুন