প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে দাপুটে জয়ে আত্মবিশ্বাসের আকাশ ছুঁয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। সেই জয়ের মধ্যদিয়ে লাল সবুজের ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে পাকিস্তানকে হারানোর অনন্য স্বাদ পেয়েছে টাইগাররা। এখন তাদের সামনে রয়েছে আরও বড় এবং ঐতিহাসিক এক অর্জনের হাতছানি। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১৬ই মে শুরু হতে যাওয়া বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টকে ঘিরে টাইগারদের সামনে নতুন স্বপ্ন।
একটি ড্র অথবা জয় পেলেই ঘরের মাঠে প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করবে বাংলাদেশ। গতকাল দলের ঐচ্ছিক অনুশীলনে খেলোয়াড়দের চোখেমুখে যে দৃঢ়তা আর শরীরী ভাষায় আত্মবিশ্বাসের ছাপ দেখা গেছে, তা ভক্তদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করছে। বোলারদের পাশাপাশি ব্যাটাররাও নেটে দীর্ঘ সময় ঘাম ঝরিয়েছেন। লাল বলের ক্রিকেটের খরা কাটিয়ে গত ম্যাচে আমাদের বোলাররা যে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন, তা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। পেস ও স্পিনের অনবদ্য রসায়নে পর্যুদস্ত হয়েছিল পাকিস্তান।
সিলেটের নয়নাভিরাম এই মাঠে একটি জমজমাট লড়াই দেখার জন্য অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমীরা যারা স্বপ্ন দেখেন এক অবিস্মরণীয় বিজয়ের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস রচনার সেই গৌরবময় মুহূর্তটির সাক্ষী হতে উন্মুখ।
পরিসংখ্যানের পাতায় বাংলাদেশের অতীত রেকর্ড খুব একটা সমৃদ্ধ নয়। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত সর্বমোট আশিটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজ খেলেছে। এর মধ্যে মাত্র দশটি সিরিজে জয়ের মুখ দেখেছে দল এবং বারোটি সিরিজ ড্র হয়েছে। অন্যদিকে দেশের মাটিতে টাইগাররা এখন পর্যন্ত মোট চুয়াল্লিশটি সিরিজ খেলেছে। নিজেদের পরিচিত কন্ডিশনেও রেকর্ড খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। ঘরের মাঠে খেলা চুয়াল্লিশটি সিরিজের মধ্যে মাত্র সাতটিতে জয়ের হাসি হেসেছে শান্তর দল এবং আটটি সিরিজ ড্র করতে সক্ষম হয়েছে। তবে সামপ্রতিক সময়ে কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কাবু করার কৌশল ভালোই রপ্ত করেছে বাংলাদেশ। ঘরোয়া ক্রিকেট বা প্রথম শ্রেণির লীগ খেলে ক্রিকেটাররা নিজেদের প্রস্তুত করেছেন। এই প্রস্তুতিই আন্তর্জাতিক আঙিনায় সুফল বয়ে আনতে সাহায্য করছে।
পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট পরিসংখ্যান স্বস্তিদায়ক ছিল না। দুই দলের দ্বৈরথে এ পর্যন্ত ছয়টি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট সিরিজে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। এর মধ্যে মাত্র একটি সিরিজে জয়ের গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সেই ঐতিহাসিক সিরিজ জয়টি এসেছিল বিদেশের মাটিতে। বাকি পাঁচটি সিরিজেই নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রেখে সিরিজ জিতে নিয়েছে সফরকারীরা। এমনকি পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো সিরিজ ড্র করার কৃতিত্বও আজ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ। ঘরের মাঠের পরিসংখ্যান তো আরও বেশি বেদনার। নিজেদের মাটিতে আজ পর্যন্ত চারটি টেস্ট সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই চারটি সিরিজের প্রতিটিতেই পরাজয়ের গ্লানি হজম করতে হয়েছে স্বাগতিকদের। পরিসংখ্যান বলছে মানসিকভাবে পাকিস্তান সব সময় এগিয়ে থেকেছে। তাদের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ এবং সাবলীল ব্যাটিং বারবার বড় পরীক্ষা নিয়েছে আমাদের বোলারদের। তবে এবার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথম ম্যাচে অর্জিত জয় পুরো ড্রেসিংরুমের আবহ পাল্টে দিয়েছে। খেলোয়াড়দের চোখে এখন শুধুই সিরিজ জয়ের স্বপ্ন। তাই তারা মরিয়া হয়ে মাঠে নামবে।
সিলেটের উইকেটে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে স্পিনারদের ভূমিকা হবে গুরুত্বপূর্ণ। দিনের প্রথম সেশনে পেসাররা কিছুটা মুভমেন্ট পেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উইকেট মন্থর হয়ে আসার সম্ভাবনা প্রবল। সে কারণে টস জয়ী অধিনায়কের আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। বোর্ডে বড় সংগ্রহ জমা করতে পারলে বোলারদের কাজ সহজ হয়ে যাবে।
প্রথম টেস্টে ব্যাটিং ইউনিট যে ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তার ধারাবাহিকতা এই ম্যাচে বজায় রাখা জরুরি। এদিকে সিরিজে পিছিয়ে পড়া পাকিস্তান দল যে মরণকামড় দেবে, তা বলাই বাহুল্য। তাদের একাদশে একাধিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রতিপক্ষ ঘুরে দাঁড়াতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। তবে নিজেদের মাঠে বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি পরিণত দল। দর্শকদের বিপুল উন্মাদনা ও নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন নিঃসন্দেহে দলের জন্য টনিক হিসেবে দারুণ কাজ করবে। সব কঠিন সমীকরণ শেষে টাইগাররা যদি নিজেদের সামর্থ্যের সেরাটা উজাড় করে দিতে পারে, তবে নতুন ইতিহাস কেবলই সময়ের অপেক্ষা।
