গাইবান্ধায় জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার একমাত্র জেনারেল হাসপাতালেও নিয়মিত মিলছে না এই টিকা। ফলে সরকারি হাসপাতালের ওপর ভরসা হারিয়ে সাধারণ মানুষ এখন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যদিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। গত ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে জেলায় তিনজনের মৃত্যুতে এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি টিকার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রোগীদের বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। সরজমিন গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে দেখা যায়, জলাতঙ্ক প্রতিষেধক কক্ষের (ডগবাইট রুম) সামনে টিকার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন রোগীরা। দীর্ঘক্ষণ কক্ষটি তালাবদ্ধ থাকার পর একজন স্বাস্থ্যকর্মী এসে রোগীদের সাফ জানিয়ে দেন হাসপাতালে কোনো টিকা নেই।
পলাশবাড়ী থেকে আসা ২৬ বছর বয়সী বিশাল তালুকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গতকাল বিড়াল আঁচড় দিয়েছিল। পরে হাসপাতালে এসে শুনছি টিকা শেষ। এখন বাইরে থেকে কেনা ছাড়া উপায় নেই। সুন্দরগঞ্জ থেকে আসা তাসপিয়ার কণ্ঠেও ঝরে পড়লো হতাশা। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে সামান্য কুকুর-বিড়ালের কামড়ের চিকিৎসা না মিললে মানুষ বড় কোনো অসুখে কোথায় যাবে? অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের নির্দিষ্ট একটি চক্র ও সিন্ডিকেটের কারণেই টিকার এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত চার মাসে ১ হাজার ৫১৭ জনকে জলাতঙ্ক টিকা দেয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে সরকারি টিকা পেয়েছেন মাত্র ৮০০ জন। বাকিরা বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনে এনে হাসপাতালের মাধ্যমে পুশ করিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে সরকারি ওষুধ সরবরাহে অনিয়ম করা হচ্ছে।
বরাদ্দ থাকলেও তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এদিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নে গত ২২শে এপ্রিল রাজমিস্ত্রি রতনেশ্বর কুমারকে একটি বেওয়ারিশ কুকুর কামড়ালে তিনি প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে জেলা হাসপাতালে যান। কোথাও টিকা না পেয়ে দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা পর বেসরকারিভাবে টিকা সংগ্রহ করেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে গত ৮ই মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। এর আগে একই কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে নন্দ রানী ও ফুলু মিয়া নামের আরও দু’জনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে ওই এলাকার ১৩ জন আক্রান্ত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে গত সোমবার কঞ্চিবাড়ি গ্রামের আফরোজা বেগম নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দিবাকর বসাক জানান, তাদের এখানে টিকার সরবরাহ ছিল না, তবে নতুন বরাদ্দের কথা চলছে। অন্যদিকে হাসপাতালের ডগবাইট ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম অনিয়মের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, টিকা শেষ- তবে দুই-তিনদিনের মধ্যে আসবে। সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. শহীদুল্লাহর সঙ্গে মুঠো ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সচেতন মহলের দাবি, সরকারি টিকার সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই অব্যবস্থাপনার পেছনে দায়ীদের দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় অকালেই ঝরে পড়বে আরও অনেক প্রাণ।
