দাপুটে জয়

দাপুটে জয়

ফন্ট সাইজ:

মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গতকাল রচিত হলো নতুন ইতিহাস। গতি, বাউন্স আর রিভার্স সুইংয়ের এক অবিশ্বাস্য প্রদর্শনীতে পাকিস্তানকে রীতিমতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। রোমাঞ্চকর এই টেস্টে ১০৪ রানের দুর্দান্ত জয়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ লীগ টেবিলে এগোলো স্বাগতিকরা। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচের শেষ দিনে নাটকীয়তার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে জয়ের নায়ক বনে যান তরুণ ফাস্ট বোলার নাহিদ রানা। তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে সফরকারী দলের ব্যাটিং লাইনআপ।

২৬৮ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১৬৩ রানেই গুটিয়ে যায় তারা। দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়, আর সবমিলিয়ে তাদের বিপক্ষে টানা তৃতীয় জয়। নাজমুল হোসেন শান্তর আগ্রাসী অধিনায়কত্ব আর বোলারদের সম্মিলিত আক্রমণে শেষ বিকালের আলো ফুরানোর আগেই উল্লাসে মাতে পুরো গ্যালারি। প্রথম চারদিনের অনেকটা সময় প্রকৃতি কেড়ে নিলেও, শেষ দিনে সময় আর প্রতিপক্ষ দুই বাধা টপকেই দারুণ এক জয় ছিনিয়ে আনলো টাইগাররা। রানার আগুনে বোলিংয়ের পাশাপাশি স্পিনারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং এই জয়ের ভিত গড়ে দেয়। টেস্ট ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য যেন গতকাল ধরা দিয়েছিল লাল সবুজের প্রতিনিধিদের হাত ধরে, ঠিক মিরপুরের চিরচেনা বুকে।

গতকাল সকালে ৩ উইকেটে ১৫২ রান নিয়ে মাঠে নামে স্বাগতিকরা। লক্ষ্য ছিল দ্রুত রান তুলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা। সেই অনুযায়ী আগ্রাসী ব্যাটিং শুরু করেন ব্যাটসম্যানরা। আগের দিনের ১৬ রানের সঙ্গে মাত্র ৬ রান যোগ করেই হাসান আলির বলে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন মুশফিকুর রহীম। এরপর ক্রিজে আসা লিটন কুমার দাসও আগ্রাসী হতে গিয়ে সীমানায় ধরা পড়েন মাত্র ১১ রানে। তবে একপ্রান্ত আগলে রেখে রানের চাকা সচল রাখেন অধিনায়ক শান্ত। প্রথম ইনিংসের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও টানা ব্যাক-টু-ব্যাক সেঞ্চুরির একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দ্রুত রান তোলার তাগিদে নোমান আলিকে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে ৮৭ রানে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন এই বাঁহাতি। তার বিদায়ের পর মেহেদী হাসান মিরাজের ২৪ ও তাসকিন আহমেদের ১১ রানের সুবাদে মধ্যাহ্নবিরতির আগেই ৯ উইকেটে ২৪০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে দল।

২৬৮ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় সফরকারীরা। ইনিংসের প্রথম ওভারেই সাজঘরের পথ দেখেন ইমাম উল হক। তবে শুরুর সেই ধাক্কা সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন দুই তরুণ ব্যাটসম্যান আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফাজাল। প্রথম ইনিংসের মতো এবারো তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু দলীয় ৫৪ রানে সেই জুটি ভাঙেন মিরাজ। দারুণ এক ডেলিভারিতে ১৫ রান করা প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান আওয়াইসের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন তিনি। সঙ্গীকে হারালেও অপর প্রান্তে সাবলীল ছিলেন ফাজাল। অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসেই হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেয়ার দারুণ এক কীর্তি গড়েন তিনি। মিরাজ ও রানার বলে টানা বাউন্ডারি হাঁকিয়ে বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এই তরুণ। সালমান আলি আগাকে সঙ্গে নিয়ে বেশ কিছুটা সময় স্বাগতিকদের হতাশায় ডুবিয়ে রাখেন তিনি। তবে চা বিরতির পর ম্যাচের দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে।

বিরতির পর প্রথম ওভারেই আরাধ্য সেই ‘ব্রেক থ্রু’ এনে দেন তাইজুল ইসলাম। তার তীক্ষ্ণ স্পিন আর দারুণ ফ্লাইটে বিভ্রান্ত হয়ে ৬৬ রানে এলবিডব্লিউ হন ফাজাল। পরের ওভারে তাসকিনের বলে স্লিপে ধরা পড়েন ২৬ রান করা সালমান। এরপরই শুরু হয় রানার আসল ধ্বংসযজ্ঞ। শান মাসুদ, সাউদ শাকিল এবং মোহাম্মদ রিজওয়ানকে পর পর সাজঘরে ফিরিয়ে প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন এই ফাস্ট বোলার। তার গতির আগুনে রীতিমতো পুড়ে ছারখার হয়ে যায় সফরকারীদের মিডল অর্ডার। রিভার্স সুইংয়ের পসরা সাজিয়ে একে একে তুলে নেন নোমান ও শাহিন শাহ আফ্রিদির উইকেট। মাত্র ৯ দশমিক ৫ ওভার বল করে ৪০ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। অন্যপ্রান্তে তাসকিন ও তাইজুল ২টি করে উইকেট নিয়ে তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন। ম্যাচের শেষ সেশনে ২৩ দশমিক ১ ওভার বাকি থাকতেই নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক এই জয়। দুই ইনিংসে অসাধারণ ব্যাটিং করে ম্যাচসেরার পুরস্কার নিজের করে নেন অধিনায়ক শান্ত। তার সামনে এখন কেবলই সিরিজ জয়ের হাতছানি।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন