শান্তর ব্যাটে স্বপ্ন, রানার বলে বাস্তব

শান্তর ব্যাটে স্বপ্ন, রানার বলে বাস্তব

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর অসাধারণ ব্যাটিং যে জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তরুণ পেসার নাহিদ রানার আগুনে বোলিংয়ে তা বাস্তব হয়েছে। সিরিজের প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়ে অবিস্মরণীয় এক জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ লীগ টেবিলের কঠিন সমীকরণেও এই দুর্দান্ত জয় বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। প্রথম ইনিংসে ৪১৩ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ২৪০ রানে নিজেদের ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। জয়ের জন্য ২৬৮ রানের বিশাল লক্ষ্যে খেলতে নেমে পাকিস্তান গুটিয়ে যায় মাত্র ১৬৩ রানে। মাত্র চল্লিশ রান খরচায় নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পাঁচটি মূল্যবান উইকেট শিকার করে পুরো প্রতিপক্ষকে একাই গুঁড়িয়ে দেন রানা। পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন অধিনায়ক নিজে। প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি খেলেছেন ৮৭ রানের এক কার্যকরী ইনিংস। ১৫০ বলের সেই ইনিংসে ছিল সাতটি দর্শনীয় বাউন্ডারি। নোমান আলীর বলে এলবিডব্লিউ হওয়ার আগে তিনি দলকে পৌঁছে দেন শক্ত অবস্থানে। শান্ত ও রানার যুগলবন্দিতে বাংলাদেশ টেস্টে তুলে নেয় অসাধারণ এক জয়।

ওপেনার ও মিড অর্ডারে ব্যর্থতা আর বৃষ্টি কোনোটিই বাধা হতে পারেনি বাংলাদেশের জয়ে। টাইগার অধিনায়ক শান্তর গড়ে দেয়া সেই ভিতে দাঁড়িয়ে বাকি কাজটুকু সেরেছেন বোলাররা। বল হাতে রীতিমতো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন রানা। চা পানের বিরতির পর তার গতির সামনে ধসে পড়ে সফরকারীদের ব্যাটিং লাইনআপ। বল হাতে আগুন ঝরিয়ে নিজের সামর্থ্যের দারুণ প্রমাণ রাখেন এই তরুণ। তার শিকার হয়ে একে একে সাজঘরে ফেরেন শান মাসুদ, সৌদ শাকিল, মোহাম্মদ রিজওয়ান, নোমান এবং শাহিন শাহ আফ্রিদি।

এক্সপ্রেস গতির পাশাপাশি নিখুঁত লাইন এবং লেন্থ বজায় রেখে তিনি প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের দিশাহারা করে তোলেন। একটি দুর্দান্ত ডেলিভারিতে মাসুদকে বোকা বানান পেসার। লিটন দাস উইকেটের পেছনে ক্যাচটি লুফে নেন অনায়াসে। এরপর শাকিলও অফ স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে একই পরিণতি বরণ করেন। সবচেয়ে দর্শনীয় ছিল ১৪৭ কিলোমিটার গতিতে নেয়া রিজওয়ানের উইকেটটি। অফ স্টাম্পের বাইরে পড়া বলটি মারাত্মকভাবে ভেতরে ঢুকে তার স্টাম্প ভেঙে দেয়। দলের জয়ে এমন আগ্রাসী বোলিং স্পেল দীর্ঘদিন মনে রাখবে দেশের অগণিত ক্রিকেট পাগল ভক্ত। যা ছিল এই ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এক বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। বোলিং তোপে সফরকারী দলের টেলএন্ডাররা কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। নোমানকে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলার পর আফ্রিদিকে শর্ট লেগের ফিল্ডার মাহমুদুল হাসান জয়ের ক্যাচে পরিণত করেন রানা।

শুধু পেসাররাই নন, স্পিনারদের অবদানও ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। মেহেদী হাসান মিরাজ এবং তাইজুল ইসলাম নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন দারুণভাবে। প্রথম ইনিংসে ৩৮৬ রান করা পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে এমন অসহায় আত্মসমর্পণ করবে, তা ছিল অভাবনীয়। আবদুল্লাহ ফজল এবং আঘা সালমান কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও তা যথেষ্ট ছিল না। স্বাগতিকদের ফিল্ডিংও ছিল বিশ্বমানের। বিশেষ করে ক্যাচিং এবং গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে বাঘেরা দেখিয়েছে চরম পেশাদারিত্ব। শান্তর বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্ব এবং বোলারদের সঠিক ব্যবহার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে সাহায্য করেছে। ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হয়েছেন শান্ত।

তার দুই ইনিংসের দৃঢ়তা এবং বোলারদের সম্মিলিত আক্রমণই মূলত এই টেস্টে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। মিরপুরের এই জয় পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা তৃতীয় টেস্ট জয়ের দারুণ এক রেকর্ড। ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে দলের সার্বিক পারফরম্যান্সে তীব্র সন্তোষ প্রকাশ করেন অধিনায়ক। তিনি স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসের কঠোর পরিশ্রমের ফসল হলো এই দারুণ সাফল্য। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিং করার সাহসী সিদ্ধান্তটি যে সম্পূর্ণ সঠিক ছিল, তা ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল দেখলেই খুব সহজে বোঝা যায়।

প্রথম দিনের শুরুতে ব্যাটিং করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও মুমিনুল হক এবং অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহীম চমৎকার ব্যাট করে দলের ওপর থেকে চাপ সম্পূর্ণ কমিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের সেই শক্ত প্রতিরোধই মূলত বড় সংগ্রহের মজবুত পথ তৈরি করে দেয়। পেসার তাসকিন আহমেদও বল হাতে নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সিলেটে সিরিজের পরবর্তী ম্যাচের আগে এই জয় দলকে দারুণ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাঘেরা এখন পরবর্তী সাফল্যের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। জয়ের এই চমৎকার ধারা অব্যাহত রাখতে গোটা দল এখন বদ্ধপরিকর।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন