রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ফিরিয়ে দিতে আপিল বিভাগের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি প্রকাশ করা হয়েছে। গত বছরের ১লা জুন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ৪ বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। সোমবার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিসহ কয়েকটি মামলায় দেয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের খালাসের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১লা আগস্ট জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে জারি করা আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়। ২০০৮ সালের নভেম্বরে জামায়াতকে নিবন্ধন সনদ দেয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে ইসি’র দেয়া নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৯ সালে রিট করেন সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ ২৫ ব্যক্তি। চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৩ সালের ১লা আগস্ট রায় দেন হাইকোর্টের ৩ সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ। একইসঙ্গে আদালত এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সনদ দেন, যা ওই বছরই আপিল হিসেবে রূপান্তরিত হয়। পাশাপাশি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে দলটি।
হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পরপরই তা স্থগিত চেয়ে জামায়াত আবেদন করে, যা ২০১৩ সালের ৫ই আগস্ট খারিজ করে দেন আপিল বিভাগের তৎকালীন চেম্বার বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। এরপর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে ২০১৮ সালের ৭ই ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জামায়াতে ইসলামীকে দেয়া নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দলটির করা আপিল ও লিভ টু আপিল ২০২৩ সালের ১৯শে নভেম্বর খারিজ করে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। আপিলকারীর পক্ষে সেদিন কোনো আইনজীবী না থাকায় আপিল বিভাগ ওই আদেশ (ডিসমিসড ফর ডিফল্ট) দেন। পরে দেরি মার্জনা করে আপিল ও লিভ টু আপিল পুনরুজ্জীবিত চেয়ে দলটির পক্ষ থেকে পৃথক আবেদন করা হয়। শুনানি নিয়ে ২০২৪ সালের ২২শে অক্টোবর আপিল বিভাগ আবেদন মঞ্জুর (রিস্টোর) করে আদেশ দেন।
এরপর জামায়াতের আপিল ও লিভ টু আপিল শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। ২০২৪ সালের ৩রা ডিসেম্বর শুনানি শুরু হয়। আর প্রতীক বরাদ্দের বিষয়ে দলটি একটি আবেদন করে, যা ওই বছর ১২ই মে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওঠে। সেদিন আদালত আপিল ও লিভ টু আপিলের সঙ্গে শুনানির জন্য আবেদনটি ট্যাগ (একসঙ্গে) করে দেন। আগের ধারাবাহিকতায় শুনানি শেষে ১লা জুন রায় দেন আপিল বিভাগ।
এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের খালাসের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। আজহারুলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় এবং মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে এর আগে আপিল বিভাগের দেয়া রায় বাতিল ঘোষণা করা হয়। অন্য কোনো মামলা না থাকলে আজহারুলকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় রিভিউ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিলে এই প্রথম কেউ খালাস পান। উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ২২শে আগস্ট মগবাজারের বাসা থেকে আজহারুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ প্রকাশ অবৈধ: গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ ও প্রকাশ করাকে অবৈধ, বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ে দেশের সব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এ-সংক্রান্ত রিপোর্টের তথ্য সংরক্ষণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের ২৬শে জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে একটি রিট আবেদন করেছিলেন। এডভোকেট ইশরাত হাসান নিজে রিটের পক্ষে শুনানি করেন, তাকে সহযোগিতা করেন এডভোকেট তানজিলা রহমান।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত। পর্যবেক্ষণ শেষে রায়ের নির্দেশনায় আদালত বলেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ক্লিনিকগুলোতে পরিচালিত অনাগত শিশুর ডায়াগনস্টিক রিপোর্টের তথ্য সংরক্ষণ ও তদারকির জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করে তা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। নির্দেশনাটির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে এবং আদালত যেন বিষয়টি ভবিষ্যতে তদারকি করতে পারে, সেজন্য এই রায়কে ‘কন্টিনিউয়াস ম্যান্ডামাস’ বা চলমান নির্দেশনা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট আদালতে দাখিলেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
