পুলিশকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখতে হবে বলে মন্তুব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা পুলিশকে এমন একটি পর্যায়ে নিতে চাই যেখানে দুর্নীতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া হবে না। সোমবার পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিগত সততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। বাহিনীর শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। আপনাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বাহিনীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা পুলিশকে এমন একটি পর্যায়ে নিতে চাই যেখানে দুর্নীতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া হবে না। তৃণমূল পর্যায়ে অপরাধ দমনে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বন্ধন তৈরি করুন। পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে পাড়ায়-মহল্লায় অপরাধের অভয়ারণ্য গুঁড়িয়ে দিতে হবে। মাদক, সন্ত্রাসবাদ এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা এখনো কাক্সিক্ষত সুনাম অর্জন করতে পারিনি। কারণ এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তির বিষয়টি জড়িত। ট্যুরিস্ট পুলিশকে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাতে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ও পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
প্রচলিত প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশিং থেকে বের হয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক প্রতিরোধমূলক পুলিশিং ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তা সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা যায়। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই অপরাধের পূর্বাভাস এবং প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয়, যা মূলত রিঅ্যাকটিভ (প্রতিক্রিয়াশীল) পুলিশিং। তবে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো প্রিভেন্টিভ পুলিশিং বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা।
পূর্বপ্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে আগেই গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে পুলিশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেবে, যাতে অপরাধটাই সংঘটিত না হতে পারে, প্রশ্ন করেন মন্ত্রী। অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চেইন অব কমান্ড যারা ভঙ্গ করবেন তাদের বিরুদ্ধে আমি মন্ত্রণালয়ে যোগদান করার পরদিনই বার্তা দিয়েছি। চেইন অব কমান্ড বজায় রাখবেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন। যেকোনো দুর্নীতির অভিযোগে আমরা বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবো। তৃণমূল পর্যায়ে অপরাধ দমনে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করুন। বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে পাড়া-মহল্লায় অপরাধীদের অভয়ারণ্য গুঁড়িয়ে দিতে হবে। মাদক, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম বলপ্রয়োগ নীতির বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মানবাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অপরাধ দমনে, তদন্ত কার্যক্রমে বা প্রসিকিউশন টিমকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে মানবাধিকার সমুন্নত রেখেই কৌশলে সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
র্যাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, র্যাবের জন্য আলাদা রেজিস্ট্রেশন বা আইনি কাঠামো তৈরির কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। আমি মন্ত্রণালয়ে যোগ দেয়ার পর দেখলাম, এই বাহিনীটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার জন্য আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই; র্যাব মূলত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের একটি নির্দিষ্ট ধারার অধীনে কাজ করে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে যদি আমরা একটি এলিট ফোর্স হিসেবে রাখতে চাই, যে নামেই হোক তবে এর সরঞ্জাম, লজিস্টিক, জনবল ও গোয়েন্দা সমর্থন সবকিছুর জন্য একটি আলাদা লেজিসলেশন বা আইন দরকার। সেখানে তাদের কর্তৃত্ব, দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে আলাদা রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে বলে জানান তিনি। পুলিশের দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত বিষয়গুলো এবং এই বাহিনীকে একটি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করছেন।
