নড়াইলের কালিয়ায় আবারো ভুল চিকিৎসায় তাজিন ইসলাম (২০) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। কালিয়া উপজেলা শহরের খাদিজা সেবা ক্লিনিকে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা ছড়িয়ে পড়ায় বেসরকারি ক্লিনিকটি তালা দিয়ে পালিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নিহত তাজিন লোহাগড়া উপজেলার মুচড়া গ্রামের ইয়াছিন মোল্যার স্ত্রী এবং কালিয়া উপজেলার উথলী গ্রামের আইয়ুব শেখের মেয়ে।
নিহতের স্বামী সাংবাদিকদের জানান, গত শনিবার দুপুরে তাজিনের প্রসব বেদনা উঠলে স্বজনরা খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে খুলনা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ডা. ইবরাহিম সরদারের তত্ত্বাবধানে সিজারিয়ান অপারেশনে তাজিন ছেলে সন্তান জন্ম দেয়। তবে পরদিন তার অবস্থার অবনতি হলে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। খুলনার ওই বেসরকারি ক্লিনিকে ৭ দিন চিকিৎসা দেয়ার পরও উন্নতি না হলে গত শনিবার বিকালে ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেয় ওই বেসরকারি হাসপাতালটি। ওইদিন বিকালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীর স্বজনরা খুলনা মেডিকেল কলেজের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করেন। ওইদিন রাত দেড়টার দিকে তার মৃত্যু হয়। নিহতের দুলাভাই ইমামুল ইসলাম রিয়ান অভিযোগ করে বলেন, ভালো ডাক্তারের নাম দেখে তারা সেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য রাজি হয়েছিলেন। পরদিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কোনো ছাড়পত্র না দিয়ে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে রেফার্ড করেন। পরে খুলনা মেডিকেলে তাজিনের মৃত্যু হয়। খুলনার ওই বেসরকারি হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় উচ্চ রক্তচাপ ছিল এবং মাত্রাতিরিক্ত অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা হয় তার শরীরে।
এ কারণেই তিনি স্ট্রোক করে ব্রেনের অংশ ড্যামেজ হয়ে যায়। একটি সূত্রের দাবি শনিবার প্রসূতি তাজিনের সিজারিয়ান অপারেশনে ডা. নাসির উদ্দিন আহম্মেদ নামের এক চিকিৎসক অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করেছিলেন। যিনি ১৯৯৯ সালে ২ মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরি থেকে দীর্ঘদিন অবসরে থাকা বয়োজ্যেষ্ঠ এই চিকিৎসক নিয়মিত কালিয়া উপজেলার বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ান অপারেশন করে আসছেন।
এদিকে নিহতের স্বজনদের দাবিÑ সিজারিয়ান অপারেশন খুলনা মেডিকেলের চিকিৎসক ডা. ইবরাহিম সরদার সম্পন্ন করেন। তবে প্রসূতির ব্যবস্থাপত্র একই হাতের লেখায় দেখা মেলে ভিন্ন চিত্র। সিজারিয়ান অপারেশন করেছেন ডা. নূর মোহাম্মদ (রাজশাহী মেডিকেল কলেজ) এবং অ্যানেস্থেশিয়া দিয়েছেন ডা. মনির। এদিকে স্বজনরা বলেন, এটা কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। অপচিকিৎসার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দেড় বছরে ‘খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর অপচিকিৎসায় এ পর্যন্ত ৬ জন প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত এক চিকিৎসক জানান, প্রত্যেক চিকিৎসকের বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) রেজিস্ট্রেশন নং থাকে। যেটি সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন পোস্টারে থাকা বাধ্যতামূলক। তবে খাদিজা সেবা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডাক্তারের নামে স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজের নাম ব্যবহার করা হলেও তাদের কারও বিএমডিসি নং চোখে পড়েনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিন্নাতুল ইসলাম জানান, ওই প্রসূতির মৃত্যু নিয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। তবে অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুর রশিদ বলেন, বিষয়টি আমরা জেনেছি। ক্লিনিক মালিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্লিনিকটি তালাবদ্ধ করে পালিয়েছে। আবারো ওই ক্লিনিক সিলগালা করা হবে।
