বৃটিশ আমলে মেদিনীপুর থেকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাম্রলিপ্ত সরকার গঠিত হয়েছিল। বৃটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন বিপ্লবী দেশপ্রাণ শাঁসমল, মাতঙ্গিনী হাজরা। সেই আন্দোলনের মাটি থেকেই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। আর এবার সেই ভূমি থেকেই শুভেন্দু অধিকারী বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।
ছিলেন বিরোধী দলনেতা, এবার সেখান থেকে সরাসরি দলনেতা। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে হয়ে উঠেছিলেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। আর দু’দুবার মমতাকে পরাজিত করার জন্য শুভেন্দুকে জায়ান্ট কিলার আখ্যা দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম।
আদ্যন্ত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান শুভেন্দু। তার পিতা শিশির অধিকারী মেদিনীপুর জেলা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার আগে থেকেই সেখানকার অতি পরিচিত কংগ্রেস নেতা ছিলেন। তবে একসময় কংগ্রেস ছেড়ে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী আলাদা দল করার পরেই। তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন শিশির অধিকারী। পরে তিনিও বিজেপিতে যোগ দেন। এখনো বিজেপিতেই রয়েছেন।
পিতার পথ ধরেই শুভেন্দু অধিকারীও একসময়ে কংগ্রেসেই ছিলেন। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করে পরে ১৯৯৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তার নিজের শহর কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন।
শুভেন্দু অধিকারী ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে শুভেন্দু কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে প্রথম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নির্বাচিত হন।
২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা এলাকা সংলগ্ন নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প হাব গড়ার পরিকল্পনা করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে সেখানকার কৃষকরা আন্দোলন শুরু করেন। তৃণমূল স্তরে সেই আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী-ই। অবশ্য দলনেত্রী হিসেবে মমতা ব্যানার্জী ছিলেন আন্দোলনের কাণ্ডারি।
২০০৯ ও ২০১৪ সালে শুভেন্দু তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক কেন্দ্র থেকে। তখন থেকেই শুভেন্দু হয়ে ওঠেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের সংগঠন গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর। সহজেই শুভেন্দু মমতার একান্ত আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। মমতা তাকে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় ‘জঙ্গলমহল’ এলাকার দায়িত্ব দিয়েছিলেন মাওবাদী প্রতিপত্তি মোকাবিলার জন্য।
তবে ২০১১’র নির্বাচনে অবশ্য প্রার্থী হননি শুভেন্দু অধিকারী। তিনি তখনো সংসদ সদস্য। বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারী ফিরে আসেন ২০১৬ সালে। মন্ত্রীও হয়েছিলেন তিনি। ততদিনে দলীয় সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন শুভেন্দু। তাকে দলের যুব সংগঠনের নেতা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জী। এই সময়ই ভাইপো অভিষেককে দিয়ে আরেকটি যুব সংগঠনের সূচনা করা হয়েছিল। এরপর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসে যত অভিষেকের উত্থান হয়েছে, মমতার কাছ থেকে তত দূরে সরেছেন শুভেন্দু।
অবশেষে ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। তারপর থেকে ক্রমাগত তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হয়ে বিজেপি’র কট্টর মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম থেকে মমতাকে হারিয়ে বিজেপি’র হয়ে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। হয়েছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। আর ৫ বছরের মধ্যে সোজা দলনেতা হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে।
