একটি প্রচ্ছদ প্রিয়জন, আপনজন হয়ে ফিরে আসার গল্প

একটি প্রচ্ছদ প্রিয়জন, আপনজন হয়ে ফিরে আসার গল্প

ফন্ট সাইজ:

একটি মাইক্রোফোন। আলো ঝলমলে মঞ্চ। পেছনে টানানো গাঢ় লাল পর্দা- যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা অপেক্ষার প্রতীক। চারদিকে ক্যামেরা, লাইট, অ্যাকশন- আর সেই সমস্ত আলো, শব্দ আর প্রত্যাশার ভিড়ে সাদা শাড়িতে দাঁড়িয়ে আমি ফারজানা ব্রাউনিয়া। এক যুগ পর যেন আবার ফিরে আসা আমার নিজের পৃথিবীতে। অনেক বছর পর আবার সেই মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। হৃদয়ের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি, বুকের ভেতর জমে থাকা হাজার অনুভূতির ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ছিল। সামনের তীব্র আলো চোখে এসে লাগছিল ঠিকই, কিন্তু সেই আলোর ঝলকানি ভেদ করেও আমি দেখতে পাচ্ছিলাম কিছু চেনা মুখ।

আমার প্রিয় মানুষগুলোকে। আমার প্রিয়জন, আপনজন। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার ভালোবাসার মানুষগুলোর সামনে। যারা আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর সাক্ষী, আমার ভেঙে পড়া রাতগুলোর সাক্ষী, আবার নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহসেরও সাক্ষী হলো আজ। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল-জীবন হয়তো অনেক কিছু কেড়ে নেয়,

অনেক সম্পর্ক বদলে যায়, অনেক পথ হারিয়ে যায় সময়ের ভিড়ে, কিন্তু সত্যিকারের স্বপ্ন কখনো মরে না।
ভালোবাসাও না। জীবনের একটা সময় হঠাৎ করেই নেমে এসেছিল গভীর অন্ধকার। এমন এক অন্ধকার, যেখানে চারপাশে হাজার মানুষ থাকলেও মানুষ নিজেকে ভীষণ একা মনে করে। যেখানে নিজের ভেতরের আলোটুকুও ধীরে ধীরে নিভে যেতে চায়। আমার জীবনেও ঠিক তেমন এক ঝড় এসেছিল। আমি ভেঙেছি, থেমেছি, নীরবে কেঁদেছি, হারিয়ে যেতে চেয়েছি সময়ের অতলে। কিন্তু আমার সেই নিভে যেতে থাকা প্রদীপটাকে কয়েকজন মানুষ বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল।

আর সেই মানুষগুলোর নাম বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে, সে আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়, আমার সমস্ত পথচলার সাথী, আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়-
লে. জে. চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী।

যিনি এই মুহূর্তে ঠিক আমার সামনেই বসে আছেন। জীবনের প্রতিটি সুখে, প্রতিটি দুঃখে, প্রতিটি ভাঙনে, প্রতিটি যুদ্ধে আমি এই মানুষটাকে আমার পাশে পেয়েছি। যখন পৃথিবী আমাকে ভুল বুঝেছে, তখনো তিনি বুঝেছেন আমাকে। যখন আমি নিজের ওপর থেকেও বিশ্বাস হারিয়েছি, তখনো তিনি আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। আমি যখন নীরবে ভেঙে পড়েছি, তিনি শব্দ না করেই আমাকে জোড়া লাগিয়েছেন। অনেক মানুষ ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু খুব কম মানুষ আছে যারা ভালোবাসাকে দায়িত্বের মতো বহন করে। তিনি সবসময় বলেন ভালোবাসা প্রমাণ চায়, ভালোবাসা অধিকার চায়। নিরন্তন ভালোবাসার প্রমাণ তিনি দিয়েই চলেছেন।

তিনি সেই মানুষ। তার ঠিক পেছনের টেবিলে বসে আছে আমার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দু’টি অধ্যায়- আমার দুই সন্তান, ফারজান সিকান্দার এবং শ্রেয়সী ব্রাউনিয়া। ওদের চোখের দিকে তাকালেই আমি বেঁচে থাকার নতুন কারণ খুঁজে পাই। ওদের ছোট্ট হাসি, ছোট্ট অভিমান, ছোট্ট ভালোবাসাগুলো আমাকে প্রতিদিন নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। আমি যতবার ভেঙে গেছি, ততবার ওদের জন্যই আবার নিজেকে গুছিয়ে দাঁড় করিয়েছি। আর স্ক্রিনের ওপারে আছে আমার ছেলে কায়সান ফারাজ আর আমার মা। আমার মা-
যার দোয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

যিনি হয়তো হাজার কষ্ট নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখে শুধু আমার ভালো থাকাটুকু চেয়েছেন সারা জীবন। আর ফারাজ- দূরে থেকেও যে, আমার হৃদয়ের খুব কাছে। আরও একজন মানুষ আছেন, যার কথা না বললে আমার এই গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তিনি শুধু একজন মানুষ নন, তিনি আমার পথচলার প্রেরণা, আমার স্বপ্ন দেখার সাহস, আমার ভেতরের সম্ভাবনাকে চিনে নেয়া এক আলোকবর্তিকা। তিনি আমার গুরু। আমার উপস্থাপক সত্তার আবিষ্কারক। “ফারজানা ব্রাউনিয়া” হয়ে ওঠার গল্পের আড়ালের সেই নিঃশব্দ জাদুকর- ফরিদুর রেজা সাগর। যিনি এই মুহূর্তে ঠিক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। তার সঙ্গে পথ চলতে চলতে পেরিয়ে গেছে দুই যুগ। আর মাইক্রোফোন, মঞ্চ, ক্যামেরা, লাইট, অ্যাকশন আমার সবচেয়ে প্রিয় সেই পৃথিবী আর আমার প্রিয় দর্শকদের থেকে বিচ্ছিন্নতারও কেটে গেছে প্রায় এক যুগ। এতদিন পর আবার যখন মাইক্রোফোনটা হাতে নিলাম, তখন মনে হয়েছিল হাতটা হয়তো কেঁপে উঠবে। কণ্ঠটা হয়তো আটকে যাবে আবেগে।

মনে হয়েছিল এত বছরের দূরত্ব আমাকে অচেনা করে দেবে আমার নিজের মঞ্চের কাছেও। কিন্তু ঘটনা ঘটলো ঠিক তার উল্টো। মনে হলো ডাঙায় ছটফট করতে থাকা একটা মাছ হঠাৎ করে আবার পানির স্পর্শ পেয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যেই যেন আমার সমস্ত সত্তা জেগে উঠলো।
মাইক্রোফোনটা হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি যেন আবার ফিরে পেলাম আমার হারিয়ে যাওয়া নিঃশ্বাস, আমার চেনা স্পন্দন, আমার নিজের অস্তিত্ব।

সেই মুহূর্তে আমার বলার কথা ছিল- “আমার ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন-”
কিন্তু হৃদয় থেকে বেরিয়ে এলো সম্পূর্ণ অন্য কথা।

আমি বললাম- “আমার ভুলগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ আমার ভালো আর মন্দ দুটোই আপনাদের। ঠিক যেমন পরিবারের প্রিয়জন আপনজনেরা একে অপরের ভালো মন্দ মিলিয়েই ভালোবাসে। ঠিক তখনই হঠাৎ করেই আমার চোখ আটকে গেল সামনের সারিতে বসে থাকা এক অনন্য ব্যক্তিত্বের দিকে। তিনি যেন ভিড়ের মাঝেও আলাদা-নীরব এক আকর্ষণ, শান্ত এক উপস্থিতি। বাংলাদেশের বহু মানুষের হৃদয়ে যিনি স্বপ্ন, অনুপ্রেরণা আর ভালোবাসার এক পরিচিত মুখ। বয়স যেন তাকে ছুঁতে পারেনি; বরং তিনি এখনো তারুণ্যের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস, নান্দনিকতা আর সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব মিলেমিশে তাকে করেছে আরও বেশি আকর্ষণীয়। তিনি আর কেউ নন- আজকের উৎসবের প্রচ্ছদ শিল্পী আফজাল হোসেন। আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই ‘অন্য প্রকাশ’-এর প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম এবং তার সহধর্মিণী, আমার প্রিয় বান্ধবী স্বর্ণার প্রতি- যিনি সত্যিই সোনার মতো উজ্জ্বল একজন মানুষ।

অবচেতন মন যেন ফিরে গেল বহু বছর পেছনে- আমার প্রথম শো, চ্যানেল আই পারফরমেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০০৩-এর সেই প্রেস কনফারেন্সে। সেদিন গুলশান ক্লাবের অডিটোরিয়ামে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম পতাকাবর্ণের সালোয়ার-কামিজ পরে। সামনে ছিল এক অপূর্ব দৃশ্য- ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’। বাংলাদেশের প্রায় সব তারকা সেদিন চ্যানেল আই-এর আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন সেই সংবাদ সম্মেলনে। আমি তখন একেবারেই নবীন উপস্থাপক। অভিজ্ঞতা বলতে প্রায় কিছুই নেই। শুধু একজন মানুষের ভরসা ছিল আমার ওপর- সাগর ভাই। তার সেই ভরসাটুকুই ছিল আমার 

একমাত্র শক্তি। আর সেই ভরসা রক্ষা করার জন্যই আমার ভেতরে জন্ম নিয়েছিল এক অদম্য ইচ্ছে- নিজেকে প্রমাণ করতেই হবে। সেদিন আমি নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম- ভালো করতেই হবে, কোনো ভুল করা যাবে না। ভয়কে পাশে সরিয়ে রেখে আমি শুধু কাজটাকেই আঁকড়ে ধরেছিলাম। আজ প্রায় দুই যুগের বেশি সময় পেরিয়ে, সেই একই মানুষটি আজ দাঁড়িয়ে আছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে সামনে আর শুধু তারকা নয়- এক নক্ষত্ররাজি। সে নক্ষত্ররাজির সঙ্গে যেন সহজেই মিশে গেলাম। অথচ এখন আর আমার ভেতরে সেই আগের সংশয় নেই, ভয় নেই, কিংবা ভুল না হওয়ার সেই অস্থিরতাও নেই। সবকিছুই এখন অনেক সহজ, স্বাভাবিক। এই দীর্ঘ পথচলা এবং নক্ষত্ররাজির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার এ গল্পের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সাগর ভাই, চ্যানেল আই পরিবার এবং আমার প্রবল আত্মবিশ্বাস আর অদম্য পরিশ্রম। অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই যেন একটি শূন্যতা আমাকে অস্থির করে তুলছিল- কারও অনুপস্থিতি আমি গভীরভাবে অনুভব করছিলাম। পুরো পরিবেশ, আলো, শব্দ- সবকিছুর মাঝেও যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি অপূর্ণ থেকে যাচ্ছিল।

আর ঠিক তখনই, হঠাৎ করেই তিনি প্রবেশ করলেন। মুহূর্তেই আমার সেই অপূর্ণ অনুভব পূর্ণতায় রূপ নিলো, আর মনে হলো পুরো অনুষ্ঠানটাই যেন তার আগমনে সম্পূর্ণ হয়ে উঠলো।

সব ক্যামেরা একসঙ্গে ছুটে গেল তার দিকে- একটি মুহূর্তে তিনি হয়ে উঠলেন পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু। সামনের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন নীল পরীর হাত থেকে বেলী ফুলের মালা গ্রহণ করে তিনি প্রবেশ করলেন এক রাজকীয় অথচ শান্ত আভিজাত্যে, যেন কোনো রাজাধিরাজ নীরবে তার আসনে ফিরে আসছেন।
তিনি আর কেউ নন- আমাদের সবার প্রিয়, শ্রদ্ধেয় মানুষ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

ঠিক এই মুহূর্তে তাকে দেখে মনে হলো- স্বর্ণকিশোরীর প্রতি তিনি যে আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিলেন, এক চিলতে আলো হয়ে যেভাবে তিনি আমাদের পথ আলোকিত করেছিলেন, তার মর্যাদা আমাদের রাখতেই হবে।
সব অতিথির আগমনে যখন অনুষ্ঠানটি ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেলো, ঠিক তখনই উন্মোচিত হলো সেই বহু প্রতীক্ষিত প্রচ্ছদ। হয়তো এটি সাধারণ একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হতে পারতো, কিন্তু অন্য প্রকাশ-এর এই উপস্থাপনায় তা হয়ে উঠলো এক অনন্য শিল্প-অভিজ্ঞতা- যা প্রচ্ছদশিল্পী ও বইপ্রেমী উভয়কেই নিয়ে গেল এক নতুন উচ্চতায়।
লাল পর্দা সরতেই ভেসে উঠলো সেই কাঙ্ক্ষিত প্রচ্ছদ, যা আফজাল হোসেন-এর হাতের ছোঁয়ায় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।

অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন উপস্থিত বিশিষ্টজনরা। তাদের মধ্যে ছিলেন- ইমদাদুল হক মিলন, শিশু সাহিত্যিক আমিরুল ইসলাম, এবং সাগর ভাইয়ের সহধর্মিণী আমাদের প্রিয় ভাবী কনা রেজা।
এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন- আনিসুল হক, আব্দুল নুর তুষার, জিল্লুর রহমান, হাবিবুর রহমান খান, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, আব্দুর রহমান, রেজানুর রহমান, আব্দুল্লাহ নাসের, কবি হাসান হাফিজ এবং আরও অনেকে। সে সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী যার সাড়া জাগানো সব রিপোর্ট বরাবরের মতো বৃহস্পতিবার সকালেও আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তার সহধর্মিণী প্রখ্যাত ছড়াকার মাহবুবা চৌধুরীর উপস্থিতিও অনুষ্ঠানকে পূর্ণতা দিয়েছিল।
অপরিদকে প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ফৈরদৌস আরার সুরের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, বরং একটি স্মরণীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ দিয়েছে।




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন