ক্রুড অয়েল সরবরাহের ২১ দিন পর চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পুনরায় চালু হয়েছে। শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শোধনাগারটিতে পূর্ণ উদ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয়। সৌদি আরব থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। ভোর ৫টা থেকেই ফায়ার্ড হিটারে প্রসেসিং শুরু হলেও এক ঘণ্টা পর থেকে উত্তপ্ত ক্রুড অয়েল থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল উৎপাদন করে নির্ধারিত ট্যাঙ্ক ফার্মের স্টোরেজে পাঠানোর কাজ শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় পর্যাপ্ত কাঁচামাল না থাকায় গত ১৪ই এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এরপর আলোচিত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদির ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে আসা চীনা জাহাজ ‘এমটি নাইমনিয়া’ গত বুধবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সমানতালে তেল খালাস প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন দু’টি ইউনিটে ১৩ ধরনের প্রায় ৪ হাজার টন জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব। এটি যাতে আবার বন্ধ না হয়, সেজন্য আগামী ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে নতুন চালান আনার ব্যবস্থা নিতে বিপিসিকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে এই শোধনাগারের দু’টি ইউনিটে, যার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার টন। এ ছাড়া মজুত থাকা অপরিশোধিত জ্বালানি দিয়ে শোধনাগারটি প্রায় ২৫ দিন চলতে পারে। ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করলে পাওয়া যাবে ২৬ হাজার টন ডিজেল, ২৪ হাজার টন ফার্নেস অয়েল, ১৬ হাজার টন পেট্রোল, ২১ হাজার টন কেরোসিন এবং ৮ হাজার টন অকটেন। ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্র জানায়, তেল যা মজুত আছে, তা দিয়ে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ দিন পরিশোধন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। পরবর্তী অপরিশোধিত তেলের চালান চলতি মাসের ২০ তারিখের পর আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরব থেকে চলতি মাসের ১০ থোক ১২ তারিখের মধ্যে নতুন চালান লোডিং হলে সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।
পরবর্তী চালানেও প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসতে পারে। জানা যায়, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য ১ লাখ টন ক্রুড বোঝাই করেও এমটি নরডিক্স পল্যাক্স জাহাজটি বাংলাদেশে আসতে পারেনি। জাহাজটি এখনো হরমুজের কারণে আটকা পড়ে আছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের আগে দেশে পৌঁছানো ক্রুডের চালানটিই ছিল সর্বশেষ চালান। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ক্রুড পরিশোধন করা হয়। গত ২১শে জানুয়ারি আসা চালানের কিছু এবং ১৮ই ফেব্রুয়ারির ১ লাখ টন মিলে ইস্টার্ন রিফাইনারি উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পরবর্তীতে উৎপাদন কমিয়েও দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও ক্রুড না আসায় একপর্যায়ে গত ১৪ই এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির চারটি ইউনিটের মধ্যে দুইটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়। অপর দুইটি ইউনিটও সীমিত পরিসরে বিটুমিন এবং পেট্রোল উৎপাদন করতে থাকে। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য ক্রুডের সংস্থান করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নানাভাবে চেষ্টা করে।
সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন ক্রুড নিয়ে আসার ব্যাপারে সবকিছু চূড়ান্ত করা হয়। বিপিসি’র ক্রুড পরিবহনের যাবতীয় ব্যবস্থা করে থাকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। সৌদি আরবের ওই ক্রুড আনার জন্য বিএসসি ‘এমটি নিনেমিয়া’ ট্যাংকারটিকে ভাড়া করে। এক লাখ ধারণক্ষমতার এই ট্যাংকারটি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে গত ২১শে এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে নোঙ্গর তোলে। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজটি লোহিত সাগর হয়ে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করে। এতে পথিমধ্যে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও শেষে বুধবার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে জাহাজ কুতুবদিয়ার অদূরে নোঙ্গর করে।
