বিগত সরকারগুলোর পতনের কারণ স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেয়া

ফন্ট সাইজ:

স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেয়াই ছিল বিগত সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। শুক্রবার রাজধানীর র‌্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে এমআরডিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন। অধিবেশনের শিরোনাম ছিল- বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের পথ। দুদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এই কনফারেন্সে সারা দেশের সাড়ে চারশ’র বেশি সাংবাদিক, সাংবাদিকতার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, বিগত সরকারগুলোর পতনের অন্যতম কারণ ছিল স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে না দেয়া। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত। তবে দেশে অতীতে যথেষ্ট পরিমাণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়নি।

বর্তমানেও হচ্ছে না, আর ভবিষ্যতেও হবে কি না, তা নির্ভর করছে সম্পাদকদের ভূমিকার ওপর বলে উল্লেখ করেন তিনি। সাংবাদিকরা সহজেই সাংবাদিকতা করতে করতে রাজনীতির মধ্যে ঢুকে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি যে একটা শাসনকাল যখন থাকে, তখন একদল সাংবাদিক যারা সেই শাসনের পক্ষে থাকে। তারা নেতৃত্বের মধ্যে থাকে। আর অন্য দলের সাংবাদিকরা চুপি চুপি ঘুরে বেড়ায় এবং তাদের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে থাকে। আবার শাসন যখন বদলায়, তখন সাংবাদিকদের নেতৃত্ব বদলে যায়। তিনি বলেন, একজন সম্পাদকের কখনোই মালিকের পিআরও (জনসংযোগ কর্মকর্তা) হওয়া উচিত নয়। মালিকদের একটি ভূমিকা থাকলেও, মালিক ও সম্পাদকের ভূমিকার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা জরুরি। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা প্রায়ই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে থাকেন এবং প্রধান বিজ্ঞাপনগুলো তাদের মাধ্যমেই আসে। তিনি বলেন, ‘সেই চাপ যিনি সামলাবেন, তিনি হলেন সম্পাদক। তিনি জানান, সংবাদমাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সম্পাদক পরিষদ সম্পাদক ও মালিকপক্ষের জন্য পৃথক আচরণবিধি তৈরির কাজ চলছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পাকিস্তানের শীর্ষ সংবাদপত্র ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তান সবখানেই অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখন অনুসন্ধানের বদলে মুনাফার দিকে ঝুঁঁকছে। এই প্রবণতা সাংবাদিকতার অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে। আমার পত্রিকা বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে, তার জন্য মাসুলও গুনতে হয়েছে। উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, পাকিস্তানের অন্যতম একজন সাহসী সাংবাদিক এক বড় আবাসন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিবেদন করেছিলেন। এর জবাবে সেই ব্যবসায়ী অন্য সব পত্রিকায় ডনের বিরুদ্ধে পূর্ণ পাতার বিজ্ঞাপন দেন। দুঃখজনকভাবে, অন্য পত্রিকাগুলো অর্থের লোভে সেই বিজ্ঞাপন ছাপাতে রাজি হয়ে যায়। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকরা যদি ‘সেলফ-সেন্সর’-এ অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকে থাকতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন জাফর আব্বাস।

ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ বলেন, এই মুহূর্তটি পরিবর্তনের বড় সুযোগ। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রেকর্ড ভালো না হলেও এই মুহূর্তটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা ঝুঁঁকির সম্মুখীন। গত এক দশকে সারা বিশ্বে কমপক্ষে ৫০০ সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমন সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বাংলাদেশে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার শক্তির কথা তুলে ধরে বলেন, ৬০টি ফেলোশিপ স্লটের বিপরীতে ১৮৮টি পিস (প্রতিবেদনের প্রস্তাব) জমা পড়েছে। কেন আমরা সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে বেশি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন দেখতে পাচ্ছি না? বস্তুনিষ্ঠ এবং ‘বুলেটপ্রুফ’ রিপোর্টিং নিশ্চিত করতে তিনি নিউজরুমের স্ব-নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এসময় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেশনটি পরিচালনা করেন বিবিসি’র সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার।

এতে আরও বক্তব্য রাখেন টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী, যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের (জিআইজেএন) নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলিয়ান শের, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস প্রমুখ।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন